একই জমিতে মাছ ও সবজির মিশ্র চাষ

- Advertisement -

দেবাশিস দত্ত : প্রতিযোগিতার বাজারে একমুখীকেন্দ্রিক কৃষি ব্যবস্থা থেকে বহুমুখী তথা মিশ্র কৃষি ব্যবস্থা কৃষকদের পক্ষে অধিক লাভজনক। সাধারণ জমিতে ধান চাষ করতে জলের প্রয়োজন, সেই জল ব্যবহার করেই মাছ চাষ সম্ভব। শুধু মানতে হবে কিছু বিধিনিষেধ। ব্লক কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা যায়, আমন ও বোরো মরশুমে মিশ্র চাষ হিসেবে ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করা যায়। বছরে এই চাষ দুবার সম্ভব। মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের কৃষি দপ্তরের উদ্যোগে ও সহায়তায় মিশ্র চাষের প্রোজেক্ট করে সকলের নজর কেড়েছেন মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের পারডুবি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাতানবাড়ি এলাকার প্রান্তিক কৃষক মলয় বর্মন। তিনি বলেন, মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের সহ কৃষি অধিকর্তা ডঃ মলয়কুমার মণ্ডল আমার বাড়িতে এসে চাষের ক্ষেত্র পরিদর্শন করেন এবং চাষের বিষয়ে মিশ্র চাষে পরামর্শ ও উৎসাহ দেন।

মলয়বাবুর পরামর্শে মিশ্র চাষ শুরু করেন তিনি। এখন ধান চাষের সঙ্গে চলছে মাছ চাষ। এছাড়াও জমির চারিদিকে আল বরাবর জাঙ্গি তৈরি করে চলছে শীতকালীন লাউ ও করলা চাষ। মলয়বাবু বলেন, প্রায় চার কাঠা জমির ঠিক মাঝখানে রোপণ করেছেন ধানের চারা এবং চারদিকে কয়েক হাত জায়গাজুড়ে খানিকটা গভীর খনন করে পলিথিন বিছিয়ে মাছের পোনা ছেড়েছেন। আবাদিকৃত সম্পূর্ণ জমির চারিদিকে জাল দিয়ে ঘেরা রয়েছে, যাতে বিভিন্ন গবাদিপশুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং মাছগুলিও বাইরে বেরোতে না পারে। জানা গিয়েছে, এ ধরনের চাষে বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হয় এবং ফসল বিক্রি করে কৃষকরা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। তিনি বলেন, বিশেষত নীচু বা মাঝারি বা দোলা জমিগুলি এ ধরনের চাষের পক্ষে সহায়ক। জমির যেদিকে জল বের হয়, তার আল বরাবর তিন ফুট চওড়া ও তিন ফুট গভীর একটি খাল খনন করে খালের নীচে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে জল নীচে যেতে না পারে। এরপর খালের উপরে মাচা তৈরি করে লতানো সবজি হিসেবে শীতকালীন লাউ, কুমড়ো, করলা চাষ করা যায়। মূল জমি চাষের পর জৈব সার হিসেবে গোবর সার, কেঁচো সার ও কিছুটা রাসায়নিকযুক্ত সার ব্যবহার করতে হবে। তবে জৈব সার ব্যবহার করলে বেশি ভালো। ধানের চারা লাগানোর ১০ থেকে ২০ দিন পর তেলাপিয়া, রুই, কাতলা সহ স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়তে হবে। ধানের পাতার রং দেখে সার ব্যবহার করতে হবে বা জমিতে পোকার আক্রমণ বেশি হলে জল কমিয়ে কীটনাশক দিতে হবে। যাতে মাছগুলো নির্দিষ্ট গর্তে চলে আসে সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। মলয়বাবু জানান, মিশ্র চাষ করে একই সঙ্গে ধান ও মাছ পাওয়া যায়। পাশাপাশি ধানের পোকামাকড় মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং মাছের অতিরিক্ত খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু খাবার প্রযোগ করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

তিনি জানান, এজন্য শুরুতেই চালের গুঁড়ো, ভুট্টার দানার গুঁড়ো ১:৩ অনুপাতে মিশিয়ে বল আকারে হেক্টর প্রতি ১০ কেজি করে সাতদিন অন্তর অন্তর দিতে হবে। মাসখানেক পর খইল ও ভুসি কুঁড়া ১:১ অনুপাতে মিশিয়ে একদিন পরপর দিতে হবে। তিনি জানান, ধানখেতে মাছ চলাচল করলে ধানের আগাছা কম হবে। সে ক্ষেত্রে কৃষকদের আগাছা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনেকটা রেহাই মিলবে। এছাড়াও মাছের নড়াচড়াতে ধানের দ্রুত বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়। সে ক্ষেত্রে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পায়। অল্প পুঁজিতে অধিক কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয় এই মিশ্র চাষে। মাছের মলও সার হিসেবে জমিতে কাজে লাগে। সঠিকভাবে মাছ চাষ করলে বিঘাপ্রতি ১০০ কেজি মাছ পাওয়া যাবে অর্থাৎ বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হবে। অন্যদিকে, ধানের ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি ২০ মন ধান পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা।

সুতরাং এই মিশ্র চাষ করলে খুব কম খরচে বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা অতি সহজেই প্রান্তিক কৃষকরা আয় করতে পারবেন বলে জানান ব্লকের সহ কৃষি অধিকর্তা। তিনি জানান, পরবর্তীতে আরও বেশি করে ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রান্তিক কৃষক মলয় বর্মন জানান, অল্প জমিতে একসঙ্গে কয়েকটি চাষ করে বেশি লাভবান হওয়ার পক্ষে মিশ্র চাষ একটি অভিনব উদ্যোগ। খুব কম সময়ে একই সঙ্গে বহুমুখী ফসল পাওয়া যায় কম খরচে ও কম পরিমাণ জমিতে। তাঁর এই কাজে খুশি ও অনুপ্রেরণা পেয়ে এবং পরামর্শ নিয়ে গ্রামের বেশকিছু প্রান্তিক কৃষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের মিশ্র চাষ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, সহ কৃষি অধিকর্তা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। এমনকি তিনি এই প্রোজেক্টের খোঁজখবর রাখছেন। মাঝে মাঝে পরিদর্শনেও আসছেন।

- Advertisement -