শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন, থাকছে না মাধ্যমিক

552
প্রতীকী

নয়াদিল্লি : মাধ্যমিক আর থাকবে না। স্কুলস্তরে একটিই ফাইনাল পরীক্ষা হবে। স্নাতকস্তরের কোর্স হবে ৪ বছরের। বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য ইত্যাদি শাখার ভেদও আর থাকবে না। কোনও ছাত্র মনে করলে পদার্থবিদ্যার পাশাপাশি ইতিহাসও পড়তে পারবে। থাকছে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগও। প্রাথমিকস্তরের শিক্ষা হবে ৫ বছরের। দেশের শিক্ষানীতিতে বুধবার বড় ঝাঁকুনি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকি, এর ফলে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের নামটাই বদলে যাচ্ছে। এই মন্ত্রকের নাম হবে শিক্ষামন্ত্রক। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রক নামটাই ছিল। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির আমলে শিক্ষামন্ত্রকের নাম বদলে হয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রক।

নতুন শিক্ষানীতিতে স্কুল শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা করা হয়েছে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সমস্ত স্কুলে হয় মাতৃভাষায় নয়তো স্থানীয় ভাষায় পঠনপাঠন। শিক্ষার অধিকার আইনের পরিধি বাড়িয়ে ৩ বছর থেকে ১৮ বছর বয়সি পড়ুয়াদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাক প্রাথমিকে বা অঙ্গনওয়াড়িতে আগে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সি পড়ুয়ারা ছিল। এবার ৩-৮ বছর প্রথম স্তর, ৮-১১ বছর দ্বিতীয় স্তর, ১১-১৪ বছর ততীয় স্তর ও ১৪-১৮ বছর চতুর্থ স্তর করা হয়েছে। প্রথম স্তরে তিন বছর অঙ্গনওয়াড়ি বা প্রাক প্রাথমিক স্কুলে ও দুবছর প্রাথমিক স্কুলে কাটাবে পড়ুয়ারা। এই স্টেজকে ফাউন্ডেশনাল স্টেজ বলা হচ্ছে। এরপর প্রিপারেটরি স্টেজে ৮-১১ বছরে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, ১১-১৪ বছরে মিডল স্টেজে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতে হবে।  সেকেন্ডারি স্টেজে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পড়ার বয়স ১৪-১৮ বছর। এখানে নবম ও দশম শ্রেণি নিয়ে প্রথম পর্যায় এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায় হবে। নতুন শিক্ষানীতিতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা সহ ভোকেশনাল শিক্ষাদান, প্রাক প্রাথমিক এবং ১০+২ কাঠামোকে বদলে ৫+৩+৩+৪ কাঠামো চালু, তিন বছরের বদলে চার বছরের স্নাতক কোর্স ইত্যাদি রয়েছে। ভারতকে জ্ঞানের নতুন সুপার পাওয়ার হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে ওই শিক্ষানীতিতে।

- Advertisement -

জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের স্বার্থে ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ ছিল এমনই এক বিরাট পরিবর্তনের সূচনা। তারপর ঢালাও আর্থিক সংস্কার এবং সরকারি ক্ষেত্রের বিলগ্নিকরণ। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ। আরএসএস এবং বিজেপি ঘোষিত কর্মসূচিগুলি পরপর সফল করার পর সংঘ পরিবারের দাবি মেনে শিক্ষাক্ষেত্রেও এই বড়সড়ো পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। তিন দশকেরও বেশি সময় পর নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি বুধবার অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন রাজীব গান্ধির সরকারের আমলে প্রথম জাতীয় শিক্ষানীতির প্রবর্তন হয়েছিল। ১৯৯২ সালে সংস্কার করা হলেও নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করা হয়নি।

নতুন শিক্ষানীতি অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে সর্বান্তকরণে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল। এই সংস্কারের ফলে আগামীদিনে লক্ষ লক্ষ জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হবে। নতুন শিক্ষানীতি অনুমোদন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রকের নাম পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল নিশাঙ্ক। ইসরোর প্রাক্তন প্রধান কে কস্তুরীরঙ্গনের নেতৃত্বাধীন কমিটি নতুন শিক্ষানীতির খসড়াটি গতবছর নিশাঙ্কের কাছে জমা দেন। প্রচুর বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াকিবহাল মহলের মতামত ও পরামর্শ নেওয়ার পর অবশেষে সেটি মন্ত্রীসভার অনুমোদন পাওয়ায় খুশি বিজেপি। ২০১৪-র লোকসভার নির্বাচনে গেরুয়া শিবির তাদের ইস্তাহারেই নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরির ঘোষণা করেছিল।

সাংবাদিক বৈঠকে বুধবার নিশাঙ্ক, কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকার, কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষা সচিব অমিত খারে এবং স্কুল শিক্ষা সচিব অনীতা কানওয়াল নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করেন। নতুন শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, সর্বস্তরে সংস্কৃত ভাষা পড়ানো হবে। মাধ্যমিকস্তর থেকে বিদেশি ভাষা শেখানো হবে। তবে কোনও পড়ুয়ার ওপর কোনও ভাষা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। গতবছর হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে বলে অভিযোগ তুলে সরগরম হয়েছিল দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি। নতুন শিক্ষানীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এখন যে প্রতিবছর পরীক্ষার নিয়ম চালু রয়েছে, তার বদলে নতুন শিক্ষানীতিতে স্কুল পড়ুয়াদের তিনবার পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয়, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষা নেওয়া হবে। দশম ও দ্বাদশে বোর্ড পরীক্ষা নেওয়া হবে ঠিকই। কিন্তু ওই পরীক্ষাগুলিরও আমূল সংস্কার করা হবে বলে জানা গিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, পড়ুয়াদের ঘাড় থেকে পাঠ্যসূচির বোঝা কমাতে এই শিক্ষানীতি তৈরি করা হয়েছে। পড়ুয়াদের একাধিক ভাষায় জ্ঞান এবং একাধিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। থাকছে না কলা এবং বিজ্ঞান শাখার চিরাচরিত প্রকারভেদ। উঠিয়ে দেওয়া হবে কারিকুলার এবং এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটির মধ্যে প্রভেদ। ভোকেশনাল এবং অ্যাকাডেমিক স্ট্রিমের মধ্যেও কোনও কট্টর পার্থক্য রাখা হবে না বলে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে।

আইআইটিগুলির মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ২০৪০ সালের মধ্যে বিজ্ঞানের বিষয়গুলি পড়ানোর পাশাপাশি কলা ও মানবীবিদ্যার পাঠদান করা হবে। কেন্দ্রের মতে, এর ফলে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে হোলিস্টিক এডুকেশন কার্যকর হবে। এমফিল কোর্স বাতিল করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে নতুন শিক্ষানীতিতে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি হায়ার এডুকেশনাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা করা হবে। কেন্দ্রের লক্ষ্য, ২০৩৫-এর মধ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তির হার ২৬.৩ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা। শিক্ষানীতিতে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে এদেশে শাখা স্থাপনের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।