সংসারের হাল ধরতে বিস্কুট বিক্রি করছে মোহন

রেজাউল হক, পুরাতন মালদা : বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরার কথা ছিল দাদার। কিন্তু দাদা কোনও কাজ করেন না। বাড়িতে অসুস্থ মা ও ছোট বোন রয়েছে। তার মধ্যে দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ায় হাঁড়ি চড়ছিল না বছর চোদ্দ মোহনের পরিবারে। বাধ্য হয়ে অসুস্থ মা ও বোনের কথা ভেবে সাইকেল নিয়ে বাড়িতে, দোকানে গিয়ে বেকারির কেক, বিস্কুট, পাউরুটি বিক্রি করছে নবম শ্রেণির পড়ুয়া মোহন শীল। কিন্তু হাজার বাধা সত্ত্বেও মোহন পড়াশোনোয় বিন্দুমাত্র গাফিলতি করে না। রোজ সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে সে পড়তেও বসে। ভবিষ্যতে পরীক্ষা ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে যাতে সে কোনওভাবে পিছিয়ে না পড়ে তার জন্যও মোহন প্রস্তুতি চালাচ্ছে। তার এই লড়াকু মনোভাবের প্রশংসা করেছেন অনেকেই। পুরাতন মালদা পুরসভার প্রশাসক কার্তিক ঘোষ মোহনের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

পুরাতন মালদার নিউ ঘোষপাড়ায় মোহন মা, বোন ও দাদার সঙ্গে থাকে। রোজ সকাল হলেই সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সঙ্গে থাকে কেক, বিস্কুট, পাঁউরুটি। বিভিন্ন দোকান ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সে কেক-বিস্কুট বিক্রি করে। সারাদিনে রোজগার হয় একশো থেকে দেড়শো টাকা। পরিবারে দাদা থাকলেও তিনি কিছু রোজগার করেন না। বাধ্য হয়ে অসুস্থ মা ও ছোট বোনের দায়িত্ব মোহন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির যে টাকা রোজগার হয় তা দিয়ে চলে মোহনের সংসার। মোহন বলে, এক বছর আগে আমার বাবা মারা গিয়েছে। বাড়িতে দাদা আছে। কিন্তু ও কোনও কাজ করে না। বাড়িতে অসুস্থ মা ও বোন আছে। আমাদের পেট চলবে কীভাবে? মা-বোনকেও দেখতে হবে। তাই আমি নিজেই রোজ সকালে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোই। বেকারির থেকে কেক, বিস্কুট, পাউরুটি কিনি। সেইগুলি নিয়ে বিভিন্ন দোকান থেকে শুরু করে বাড়ি বাড়ি যাই। যা রোজগার হয় তা দিয়ে কোনওরকমে আমাদের সংসার চলে। শহরের একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ি। কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ রাখিনি। সারাদিন কাজকর্মের পর রাতে বাড়িতে গিয়ে পড়তে বসি। অভাবের সংসার। তাই কোনও গৃহশিক্ষক নিতে পারিনি। এই অবস্থায় নিজেই পরিশ্রম করে রোজগারের পথ বেছে নিয়েছি।

- Advertisement -

মোহনের মা সুমিত্রাদেবী বলেন, আমাদের অভাবের সংসার। এখন কোনওরকমে ছোট ছেলের রোজগারের ভরসায় আছি। গোটাদিনে ও যা রোজগার করে, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সবটাই আমার হাতে তুলে দেয়। কতদিন এইভাবে চলবে জানি না। কোনওরকমে বাঁচার চেষ্টা চালাচ্ছি। মোহনের লড়াইয়ে প্রশংসা করেছেন ব্যবসায়ী রাজকুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, মোহন প্রতিদিন সকালে বেকারির কেক-বিস্কুট নিয়ে দোকানে বিক্রি করতে আসে। এত অল্প বয়সে এইভাবে ও লড়াই চালাচ্ছে। পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছে। এইরকম লড়াকু মানসিকতাকে সেলাম জানাতে হয়। তবে প্রশাসন যদি ওর পাশে দাঁড়ায়, ওর খুব সুবিধে হবে। মোহনের কথা শুনে হতচকিত হয়েছেন পুরাতন মালদা পুরসভার প্রশাসক কার্তিক ঘোষ। তিনি বলেন, এই ঘটনার কথা আমি জানতাম না। সংবাদমাধ্যমের থেকেই বিষয়টি জানলাম। ছেলেটি পুরাতন মালদা পুর এলাকার বিভিন্ন দোকানে দোকানে গিয়ে বেকারির খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করে। ওই ছাত্রের পরিবারকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।