যন্ত্রণা বুকে নিয়ে রাত জাগে সীমান্তের মহিষগাঁও

84

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রাম। কাছাকাছি নেই কোনও সরকারি হাসপাতাল। ফলে রাতবিরেতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে অপেক্ষা করতে হবে সকাল পর্যন্ত। সারা রাত যন্ত্রণা চেপে নিয়েই অপেক্ষা করার, কখন ভোর হবে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মাকড়হাট ও মহিষগাঁও গ্রামে গিয়ে ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই গ্রামবাসীরা একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিলেন। ভারতের সিম কার্ড এখানে থমকে যায়। হাসপাতাল পৌঁছোনোর আগে ভুটভুটিতেই জন্ম হয়ে যায় শিশুর। ইঞ্জিনচালিত ভুটভুটিই এখন সীমান্তবাসীদের জীবনরেখা। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র বাহন। তার ওপর দুই পারের জওয়ানদের কড়া শাসনে প্রতিদিন ভোর নামে মহিষগাঁও সীমান্তের সংসারে। তারকাঁটার বেড়া ঘেঁষে থাকা খড়ের ঘরগুলির দুয়ারে পা দিতেই হইচই পড়ে গেল বাসিন্দাদের মধ্যে। কে কার আগে নিজেদের সমস্যার কথা জানাবেন তা নিয়ে কাড়াকাড়ি। তাঁদের সাফ কথা, যে প্রার্থীই ভোট চাইতে আসুন না কেন, সীমান্তবর্তী গ্রামে হাসপাতাল গড়ার পাকা কথা দিতে হবে। নইলে তাঁরা অন্য কথা ভাববেন।

উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদে চৌনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের মাকড়হাট, বামোর সীমান্ত। হাত বাড়ালেই বাংলাদেশ। ৩৬৫ দিন সেখানে ঘড়ির কাঁটা ধরে স্রেফ টিকে থাকার লড়াই করতে হয় প্রায় ১২০০ মানুষকে। শুধু অগ্রহায়ণের মিলন মেলা ছাড়া নতুন কোনও খবর পরিবারগুলির ভাগ্যে জোটে না। তা ভালোই বোঝেন ৫৫ বছরের কুদ্দুস আলি। কেমন দেখছেন? প্রশ্নটা করতেই রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে জবাব দিলেন, কেউ কিছু উপকার করতে পারবে না। সন্ধে সাতটার পর হাট করে বাড়ি ঢুকতে পারিনি অনেক দিন। বিএসএফ রাস্তায় আটকে রাতভর ক্যাম্পে বসিয়ে রেখে দিয়েছিল আমাকে। মেয়ে রাতে ভাত বেড়ে অপেক্ষা করছিল। তাকে দেখা পর্যন্ত করতে দেয়নি। শুধু কী তাই, সীমান্তবাহিনীদের রাস্তা ধরে রোজ যাতায়াত করতে হয়। বিকল্প কোনও রাস্তা আজও গড়ে ওঠেনি। ফলে একটু বেচাল হলেই হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় সীমান্তবাহিনীর।

- Advertisement -

প্রতিদিনের এই কষ্ট আর সহ্য হয় না। কান্না বুকে নিয়ে বাবার অপেক্ষায় রাত জাগা কিশোরী রোজিনা খাতুন বলতেও ছাড়ল না। অন্যদিকে, কাঁটাতারের ওপারে ভারত ভূখণ্ডে এপারের বাসিন্দাদের কয়েকশো আবাদি জমি রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীদের (বিজিবি) রোষানলের মুখে প্রায়শই পড়তে হয় মহিষগাঁও, মাকড়হাট সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের। বছর চারেক আগে চাষ করতে গিয়ে বিজিবির গুলিতে প্রাণ হারান এক ভারতীয় কৃষক। ফলে এপার আর ওপার মিলিয়ে যন্ত্রণার খাঁড়া ঝুলে থাকে প্রতি ক্ষণে। সীমান্তবাসী হওয়ায় দুর্ভাগ্যের কাঁটা নিয়ে প্রতিদিন অসম লড়াই লড়তে হয় গ্রামবাসীদের। এলাকায় একটাই প্রাথমিক স্কুল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নেই কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত দুপারের দুঃস্বপ্নের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় সীমান্তের বেড়ার পাশে থাকা এই মানুষগুলোকে।

এসেছে আরও একটি ভোট। বান ডেকেছে প্রতিশ্রুতির। বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ি বলছেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে আমরা ক্ষমতায় আসলে সীমান্তবর্তী গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। সিপিএমের জেলা সম্পাদক অপূর্ব পাল বলেন, হেমতাবাদে যা উন্নয়ন হয়েছে, তা সিপিএমের আমলেই। তারপর সব থমকে রয়েছে। পঞ্চায়েতের প্রধান ও সদস্যরা এখন কোটিপতি। ১০০ দিনের কাজ এখনও কেউ ঠিকঠাক পায় না। কংগ্রেসের জেলা সভাপতি তথা রায়গঞ্জের বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, সীমান্তের মানুষজনের জন্য কংগ্রেসের তরফে চৈনগর গ্রাম পঞ্চায়েতকে একটি অ্যাম্বুল্যান্স দেওয়া হয়েছিল। সেই অ্যাম্বুল্যান্সের আর কোনও হদিস নেই। তৃণমূলের জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, হেমতাবাদ বিধানসভা কেন্দ্র এলাকায় যা উন্নয়ন হয়েছে তা তৃণমূলের আমলে। ভোটের আগে বিরোধীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে।