জাতীয় সড়কে তোলাবাজির সুতো টানছেন কলকাতার দাদা

অরুণ ঝা : কেউ কখনও শুনেছেন জাতীয় সড়ক বিক্রি হয়? তাও আবার তোলা আদায়ে জন্য? এলাকাভিত্তিক তোলা আদায়ে ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য আবার আলাদা-আলাদা রেট? প্রথমে একটু আশ্চর্য হয়েছিলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, গভীরের রহস্য আরও ভয়ংকর। কয়লা, বালি, সুপারি, গোরু থেকে জাতীয় সড়ক ধরে যাই পাচার হোক না কেন তার বখরা বা প্রণামি কোথায় কোথায় যায়, সে সব কথা আর নতুন কিছু নয়।

সবাই এতদিন জেনে এসেছেন, পুলিশের একাংশের মদতেই নাকি এই কালা কারবার চলে। কিন্তু গোটা চক্রে পুলিশ বা তার কর্তাদের একাংশ তো পেয়াদা মাত্র। আসল খিলাড়ি রিমোট হাতে অন্যত্র বসে রয়েছেন। তাঁর নির্দেশের বাইরে গেলে পুলিশের কর্তারাও রাতারাতি সুন্দরবন বা জঙ্গলমহলে বদলি হয়ে যেতে পারেন। সুখে থাকতে ভূতের কিল খাওয়ার মানসিকতা কজনেরই বা থাকে বলুন? ফলে নির্দেশ মেনে স্যরকে খুশি করাও হল, সঙ্গে টেবিলে যা পৌঁছে যাচ্ছে সেটা তো উপরি পাওনা।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গজুড়েই জাতীয় সড়কে বালি, গোরু, কয়লা বা সুপারির গাড়ি থেকে তোলা আদায়ে কালা কারবার রমরমিয়ে চলে। এই তোলা আদায়কারীদের নেটওয়ার্ক এতটাই ভালো যে কোথাও অভিযোগ জানিয়ে কাজ হয় না। একেবারে ওপরমহল পর্যন্ত সেটিং করা থাকে। এই লাইনে কাজ করা এক পুরোনো তোলাবাজ জানালেন, কলকাতার দাদাদের প্রথমে খুশি করতে হয়। ২৫ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার প্রণামি দিতেই হবে। তারপর মাসোহারা আলাদা। এবার সেই দাদারাই জাতীয় সড়কে কার লাইন কতদূর তা ঠিক করে দেবে। লাইনের পারমিট পাওয়ার জন্য যেখানে ফোন যাওয়ার ঠিক চলে যাবে।

শুধু এটুকুই নয়। ধরুন বালি, সুপারি, কয়লা বা গোরু পাচারের সঙ্গে যারাই যুক্ত তাদের আবার এই লাইন মাফিয়াদের কন্ট্রোলে আসা বাধ্যতামূলক। কেউ বেগরবাই করলেই পুলিশের হ্যাপা পোয়ানো শুরু। শেলটার মাফিয়াদের নির্দেশ, লাইনে চলতে হলে গাড়ি প্রতি মাসোহারা তাদের দিতেই হবে। তোলাবাজচক্র সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতার দাদারা যাদের মাথায় হাত রাখবেন তারাই হয়ে উঠবে শেলটার কিং। এমনও জানা গেল, কর্তাদের মাসোহারা ঠিকঠাক পৌঁছে গেলেও থানাগুলি অনেক সময় বকেয়াতে চলে।

কিন্তু কারও মুখ খোলার উপায় নেই। কলকাতার দাদার মেজাজ বিগড়োলেই যে সর্বনাশ। শুনলে অবাক হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু প্রশাসনিক আমলাদের একাংশের বিরুদ্ধেও গাদা গাদা অভিযোগ করেও খোদ শাসকদলের স্থানীয় নেতারা কিছু করতে পারেননি। কলকাতার দাদার বরাভয়ে প্রশাসনিক আমলাদের একাংশ স্থানীয় নেতাদের পাত্তা দেন না। এমনকি উত্তরবঙ্গের একটি জেলার শীর্ষ আমলার বিরুদ্ধে খোদ টিম পিকে একাধিক অভিযোগের কথা কলকাতায় পৌঁছে দেওয়ার পরেও সেই কর্তা বহালতবিয়তে জেলায় রয়েছেন। টিম পিকে-ও গোটা ঘটনায় হতভম্ব।

এই চক্রে অনেক সময় পুলিশের ওপর দায়িত্ব বর্তায় এলাকার সাংবাদিকদের সেটিং করার। বিভিন্ন থানার আধিকারিকরা সাংবাদিকদের ডেকে কাজু-কিশমিশ খাইয়ে চেষ্টা করবেন কনফিডেন্সে নেওয়ার। সাংবাদিক বেঁকে বসলে আধিকারিকের পরামর্শ হল, দাদা কী দরকার এত সতী হওয়ার। আগে জীবন। পরে সবকিছু। অর্থাৎ ঠান্ডা গলায় আপনাকে বুঝিয়ে দেওয়া হল, ট্র‌্যাকের বাইরে যেও না ভাই। তাতে বিপদ আছে।

এদিকে, কলকাতার দাদারা জাতীয় সড়কের লাইন বিক্রি করেছেন বলে স্থানীয় দাদাদের বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না। চোখের সামনে কোটি কোটি টাকা ভেসে চলে গেলেও তাতে হাত দেওয়ার কোনও উপায় নেই। কারণ তা করতে গেলে আমও যাবে, সঙ্গে ছালাও যাবে। দলের পদ গেলে স্থানীয় দাদাদের অনেকের ফুলেফেঁপে ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে লাইন মাফিয়ারা কলকাতার দাদাদের আশীর্বাদধন্য হয়ে পুলিশ-প্রশাসনের কর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় দাদাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে।

এদিকে, জাতীয় সড়ক কেনাবেচার কারবার নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলার রাজনীতিতে। এই টাকার ভাগবাঁটোয়ারার সমীকরণে এলাকার ভোট রাজনীতি সামাল দেওয়া স্থানীয় নেতাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে উঠেছে। কেননা, কলকাতার দাদাদের সঙ্গে জাতীয় সড়কে মাফিয়াদের হৃদ্যতা, শেলটার লাইন বিক্রি, কোটি টাকার ভাগবাঁটোয়ারা- সবই ভোট ম্যানেজারদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। বিধানসভা ভোটের আগে এই অঙ্ক স্থানীয় নেতারা কীভাবে মেলান সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।