মা করোনা আক্রান্ত, মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত তিন মাসের শিশু

167

রায়গঞ্জ: নবজাতকের বয়স ৩ মাস। ঠিকমতো মায়ের স্নেহ পায়নি সে। করোনা মারণ রোগে মা আক্রান্ত। তাই অন্যদের মতো ভালো করে কোলে ওঠা হয়নি শিশুর। এমনকি সামনে ধরে সন্তানকে আদর করতে সাহস হয়নি মায়ের। অব্যক্ত যন্ত্রণায় সময় কাটছে তাদের। রায়গঞ্জ থানার গৌরী গ্রাম পঞ্চায়েতের ইটালের ঘটনা। করোনা আক্রান্ত মা হাসপাতালে লড়ছেন ঘরে ফেরার জন্য।

বহু আগে থেকেই গলব্লাডারে স্টোন সহ একাধিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। পাশাপাশি তিন মাস আগে পুত্র সন্তান জন্ম হওয়ার সময় শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। সদ্যোজাতকের পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে রেখে হায়দ্রাবাদের চিকিৎসার জন্য যান স্বামীর সঙ্গে। এর মধ্যেই আচমকা লকডাউন। দীর্ঘ দু’মাস ফিরতে পারেনি বাড়িতে। শেষমেষ পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হলে দিন কয়েক আগে রায়গঞ্জের গ্রামের বাড়িতে ফেরে। কিন্তু লিভার ও গলব্লাডারের সমস্যায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। গলব্লাডারে স্টোন পরীক্ষা করার জন্য প্রথমে সোয়াব টেস্টের পরীক্ষার রিপোর্ট করতে বলা হয়। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই আরটিপিসিআর ল্যাবে লালার নমুনা নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার লালারস টেস্টের রিপোর্ট আসতেই কোভিড পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর থেকে মুষড়ে পড়েছে গোটা পরিবার।

- Advertisement -

বধূর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, শিশুর জন্মের পর থেকে নিজের ছেলেকে একবারও ঠিকমতো কোলে নিতে পারেনি সে। বধূর দাদা বলেন, বোনের কিছু হয়ে গেলে, শিশুটির কি হবে?

অন্যদিকে, রায়গঞ্জ থানার বাহিন গ্রাম পঞ্চায়েতের লোহুজ গ্রামের ১৯ বছরের গৃহবধূ প্রসব বেদনা নিয়ে শুক্রবার বিকেলে ভর্তি হয়। সিজার হওয়ার কথা ছিল ওই গৃহবধূর। তার আগে লালার নমুনা সংগ্রহ করে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি ল্যাবে পাঠানো হয়। রাত বারোটার নাগাদ গর্ভবতী ওই মহিলার রিপোর্ট পজিটিভ আসতেই রীতিমতো হুলুস্থূল কান্ড বেঁধে যায় রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগে। রিপোর্ট আসার আগেই ওই গৃহবধূ পুত্র সন্তান প্রসব করেন। এরপরই রিপোর্ট আসে। গাইনি বিভাগের লেবার রুমে নার্সরা রীতিমতো চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। একপ্রকার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আসতে হয় মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে।

এরপর এদিন সকালে ওই গৃহবধূ ও সদ্যজাত পুত্র সন্তানকে নিয়ে রায়গঞ্জের ছটপারুয়া এলাকার কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই গৃহবধূর স্বামী মোসারফ আলমের অভিযোগ, আমার স্ত্রী পুত্র সন্তান জন্ম দিলেও, দীর্ঘ তিন ঘন্টা লেবার রুমে ফেলে রাখা হয়। করোনা পজিটিভের কারণে আমাদের মারতে আসে স্বাস্থ্যকর্মীরা। এরপর পরিবারের লোকেরাই লেবার রুম থেকে বের করে বেডে নিয়ে আসে। এদিন সকালে কোভিড হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স গিয়ে সদ্যোজাত শিশু ও গৃহবধূকে উদ্ধার করে রায়গঞ্জের কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করে।

এছাড়া রায়গঞ্জ থানার গৌরী গ্রাম পঞ্চায়েতের অমৃতখন্ডের বাসিন্দা বছর একুশের গৃহবধূ প্রসব বেদনা নিয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলে লালার নমুনা পরীক্ষা করতেই করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর অন্তঃসত্ত্বা বধূকে রায়গঞ্জের কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করে। যদিও এখনও পর্যন্ত ওই গৃহবধূর সিজার করা হয়নি।

এই প্রসঙ্গে কোভিড হাসপাতাল সুপার ডা দিলীপ কুমার গুপ্তা বলেন, “ অপারেশন থিয়েটার রেডি করা রয়েছে। শনিবার রাতেই সিজার করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। যদিও রতন সরকার সহ দু’জন গাইনি চিকিৎসক এদিন বিকেল পাঁচটার নাগাদ ওই অন্তঃসত্ত্বা বধূকে দেখে যায়।”

কোভিড হাসপাতালের নার্সিং সুপার বাপি বিশ্বাস বলেন,“ অপারেশন থিয়েটার রেডি করা রয়েছে। রাতে কোভিড আক্রান্ত ওই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে সিজার করার কথা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম নরমালে হওয়ার জন্য। কিন্তু তা না হওয়ার কারণেই চিকিৎসকরা সিজার করা কথা বলেন।” জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রবীন্দ্রনাথ প্রধান বলেন, “কোভিড হাসপাতালে যে তিনজন মা ভর্তি রয়েছে, তারা প্রত্যেকেই সুস্থ রয়েছে।”