মায়ের জ্বর, জামা জলে ভিজিয়ে সেবায় শিশুপুত্র

2921

দিব্যেন্দু সিনহা, জলপাইগুড়ি: দৃশ্য এক-পানীয় জলের কল থেকে কিছু দূরে এক মহিলা মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়েছেন। আর বছর দুয়েকের একটি শিশু তার পরনের জামা খুলে ছুটে গিয়ে কলের জলে জামাটি ভিজিয়ে এনে মহিলার মাথায় দিচ্ছে। দৃশ্য দুই-আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকর্মীরা নিজেরা এগিয়ে না এসে শিশুটিকে বলে দিচ্ছেন কী করতে হবে। আবার এই ঘটনা ক্যামেরাবন্দি করতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাধা দিচ্ছেন তাঁরা। শিশুটিকে জিজ্ঞাসা করা হলে আধো উচ্চারণে বলছে, মার জ্বর, তাই জামা ভিজিয়ে মাথায় দিচ্ছি। উলঙ্গ অবস্থায় শিশুটিকে এভাবে মায়ের শুশ্রূষা করতে দেখে অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। পরে অবশ্য পুরসভার কর্মীরা এসে মহিলা এবং শিশুটিকে পুরসভার আশ্রয় ভবনে নিয়ে যান।

না, এটা কোনও রঙ্গমঞ্চের নাটক নয়। লকডাউনের বাজারে এই ঘটনা দেখা গেল জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানার প্রতীক্ষালয়ে। করোনার জেরে পরিচারিকার কাজ হারাতে হয়েছে। স্বামী অন্য মহিলাকে ঘরে তুলেছে। এই অবস্থায় দুই বছরের পুত্রসন্তানকে নিয়ে কখনও হাসপাতালের প্রতীক্ষালয়ে আবার কখনও সরকারি দপ্তরের বারান্দায় আশ্রয় নিচ্ছেন রেখা সরকার। পরিস্থিতি এমন যে, তিনি তাঁর সন্তানের মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দিতে পারছেন না। গতকাল থেকে জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানার প্রতীক্ষালয়ে আশ্রয় নেন রেখাদেবী। কয়েকদিন থেকে ঠিকমতো খাবার না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

- Advertisement -

রেখা সরকার বলেন, কয়েকদিন খেতে না পেয়ে সকাল থেকেই শরীর প্রচণ্ড খারাপ হয়ে পড়ে। জল আনতে গিয়ে কোতোয়ালি থানার ভিতরে কলের সামনে বসে পড়ি। এদিকে, মাকে মাটিতে বসে পড়তে দেখে তাঁর দুবছরের পুত্রসন্তান কী করবে বুঝতে পারছিল না। এই পরিস্থিতিতে পাশ থেকে কেউ একজন রেখাদেবীর মাথায় জল দিতে বলেন। একথা শুনে শিশুটি তার মায়ের মাথায় জল দেওয়ার কোনও পাত্র না পেয়ে নিজের জামা ও প্যান্ট খুলে কলের জলে তা ভিজিয়ে সেই জল এনে মায়ে মাথায় দিতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। বিষয়টি নজরে আসার পরই রেখাদেবীর খাবারের ব্যবস্থা করেন থানার আইসি বিপুল সিনহা।

কোতোয়ালি থানা থেকে জানানো হয়, অসুস্থ ওই মহিলা শিশুপুত্রকে নিয়ে থানার প্রতীক্ষালয়ে আশ্রয় নেন। থানার পক্ষ থেকে তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। পরে পুরসভার হাতে মা ও শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে এই খবর পেয়ে থানায় আসেন জলপাইগুড়ি পুরসভার প্রশাসক বোর্ডের সদস্য সৈকত চট্টোপাধ্যায়। তিনি রেখাদেবীর সঙ্গে কথা বলেন। পরে তাঁকে পুরসভার আশ্রয় ভবনে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সৈকতবাবু বলেন, আজ যেটা ঘটেছে তা হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। জলপাইগুড়ি পুরসভার ভবঘুরেদের জন্য যে আশ্রয় ভবন রয়েছে, সেই ভবনে মহিলার থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মহিলার যতদিন ইচ্ছে  ততদিন ছেলেকে নিয়ে আমাদের হেপাজতেই থাকবেন।