ভোট এলেই ভয়ে বুক কাঁপে রাজকুমারের মায়ের

140

নিতাই সাহা, ফাঁসিদেওয়া : ‘ওরা কেউ কথা রাখেননি। আমার ছোট ছেলেটার চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কেমন আছি, এখন সেই খোঁজও নেন না কেউ। কোনও মতে দিন কেটে যাচ্ছে আমাদের।’ বারান্দায় বসে কথাগুলি বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রয়াত প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায়ের মা। শাড়ির আঁচল দিয়ে দুচোখ মুছে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলেন, এমন হতভাগা মা আর কজন আছে বলতে পারেন? আমার বেঁচে থেকেই বা লাভ কি বলতে পারেন? এরপরই ভোটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আমার মতো আর কোনও মায়ের কোল যেন খালি না হয়ে যায়। শুধু ভোটকর্মী নয়, সরকারের তরফে যেন প্রত্যেকের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা হয়।

গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ইটাহারে ভোটের ডিউটি করতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান ফাঁসিদেওয়া ব্লকের কান্তিভিটার বাসিন্দা, পেশায় স্কুল শিক্ষক রাজকুমার রায়। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা বাদে রেললাইনের পাশ থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এরপরই রাজকুমার রায়ের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত চেয়ে সুর চড়তে থাকে বিভিন্ন মহলে। রাজকুমারবাবুর বাড়িতে ভিড় জমতে শুরু করে নেতা-মন্ত্রীদের। মৃত্যুরহস্যের তদন্তের আশ্বাসের পাশাপাশি মেলে একাধিক প্রতিশ্রুতি। রাজকুমার রায়ের মা অন্নদা রায়ের অভিযোগ, কতই না প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলাম ছেলের মৃত্যুর পর। কিন্তু কোথায় কী? আমার ছোট ছেলেটা আজও চাকরি পেল না। নিজেদের কিছুটা জমি ছিল বলে রক্ষে। কোনওমতে চাষবাস করে পেট চলছে। নইলে কী যে হত? মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই রাজকুমার রায়ের বাবা প্রিয়নাথ রায় বলে ওঠেন, পরিবারের রোজগেরে ছেলে ছিল। আমাদের বুড়ো বয়সের অবলম্বন। কিন্তু এখন আর কী? সব শেষ। অবলম্বন হারিয়ে কোনওমতে বেঁচে আছি আমরা।

- Advertisement -

কান্তিভিটায় রাজকুমার রায়ের একচালা বাড়ি, পাশে রয়েছে গোয়াল। চতুর্দিকেই দারিদ্র‌্যের ছাপ স্পষ্ট। বাড়িতে রাজকুমারবাবুর মা-বাবা ছাড়াও থাকেন ভাই,ভাইয়ের স্ত্রী ও তাঁদের দুই সন্তান। বাড়ির পিছনের দিকেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল রাজকুমার রায়ের মৃতদেহ। এখন ওই সমাধিই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বাঁচার রসদ। সেখানেই সময় কাটে তাঁদের। রাজকুমার রায়ের পরিবার একেবারে যে সাহায্য পাননি তা নয়। রাজ্য সরকারের তরফে আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের তরফে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া রাজকুমারবাবুর স্ত্রী অর্পিতা রায়বর্মন রাজ্য সরকারের চাকরিও পেয়েছেন। কিন্তু তিনি এখন সন্তানদের নিয়ে রায়গঞ্জে থাকেন। দুর্গাপুজোর সময় কয়েকদিনের জন্য আসেন শ্বশুরবাড়িতে। তবে এই নিয়ে আক্ষেপ নেই রাজকুমারবাবুর বাবা-মায়ের।

প্রিয়নাথ রায় বলেন, আমাদের যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হওয়ার নয়। কাকে আর কী বলব। কেউ তো আর আমাদের কোনও খোঁজ রাখে না। অন্নদা রায় বলেন, ভোট আসলেই বড় ভয় হয়। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। আমার তরতাজা ছেলেটা ভোটের কাজে গেল, কিন্তু আর ফিরল না। তাই এখন যদি শুনি কেউ ভোটের কাজে যাচ্ছে, মন খারাপ হয়ে যায়। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, কোনও মায়ের কোল যেন খালি না হয়। ভোটের সময় যেন নিরাপত্তা আরও ভালো করা হয়। ভোট যেন শান্তিপূর্ণ হয়। আর কেউ যেন চলে না যায়।