মাদার্স ডেতে চোখে জল সন্তানহারা দুই ভিক্ষুকের

315

শিলিগুড়ি : লকডাউনেও ঘটা করে পালিত হল মাদার্স ডে। মায়েদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছেন সন্তানরা। কেউ মায়ের জন্যে নিজের হাতে রান্না করেছেন, আবার কেউ মাকে দিয়ে কেক কাটিয়ে দিনটি উদযাপন করেছেন। সেই ছবি পোস্ট করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এরই মধ্যে শিলিগুড়ির সন্তানহারা দুই ভিক্ষুক মা সবার অলক্ষ্যে সন্তানদের জন্য চোখের জল ফেললেন।

ময়নাগুড়ির চূড়াভাণ্ডারের বাসিন্দা ধনবালা বর্মন এবং মাথাভাঙ্গার বাসিন্দা আরতি দে। একজন ৭০, অপরজনের বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই। দুজনের জীবনের গল্পই করুণ। ধনবালাদেবীর চূড়াভাণ্ডারে স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখেই ছিলেন। বছর কুড়ি আগে স্বামীর মৃত্যুতে সংসারে বাজ পড়ে। লড়াই করে ছেলেকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান। কিন্তু ছেলে বড় হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে মাকে ছেড়ে চলে যেতেই যুদ্ধটা থেমে যায়। সব হারিয়ে ধনবালা চলে আসেন শিলিগুড়িতে। ভিক্ষে করেই নিজের জন্যে দুবেলা খাবার জোগাড় করছিলেন। বছর চারেক আগে ছেলের কথা মনে করে একবার গ্রামের বাড়িতে যেতেই জানতে পারেন, অনেকদিন আগেই আত্ম্যহত্যা করেছে ছেলে। এরপর ফের চলে আসেন শিলিগুড়িতে। আরতিদেবীর জীবনকাহিনীও করুণ। স্বামী মারা যাওয়ার আগেই চিকিত্সার অভাবে মৃত্যু হয়েছে তাঁর দুই সন্তানের। এরপর মাথাভাঙ্গার ভিটেমাটি বিক্রি করে স্বামীর সঙ্গে চলে যান অসমে। কিন্তু সেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর দুবেলা অন্ন জোগাড়ে সমস্যা হচ্ছিল। স্থানীয় এক হোটেল ব্যবসায়ী কাজ দিয়েছিলেন আরতিদেবীকে। কিন্তু বছর দশেক আগে সেখানে ঝামেলা হওয়ায় হোটেল মালিক দিল্লিগামী ট্রেনে তাঁকে তুলে দেন। সেই ট্রেনে চেপে শিলিগুড়িতে এসে নামেন আরতিদেবী। পরিচয় হয় দুই বিধবা মহিলার। পরিচয় থেকে সখ্য। সেই থেকে দুজনেই থাকতেন শিলিগুড়ি জংশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। পরে দুজনে মিলে মাসিক ১০০০ টাকার ভাড়ায় ঘর ভাড়া নেন। ভিক্ষে করে যা আয় হত, তা দিয়ে ঘর ভাড়া দিয়ে কোনওমতে দুবেলা খাবার জুটছিল। কিন্তু দেশজুড়ে লকডাউন দুজনের জীবনে পরিবর্তন এনে দিয়েছে। লকডাউনের জেরে ভিক্ষে না জোটায় প্রায় আধপেটাই খেয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। তাই ঘর ভাড়া দিতে পারেননি। সাহায্যের আশায় প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাসের কাছের পেট্রোল পাম্পের সামনে বসে থাকছেন দুজন। কখনও মুড়ি, কখনও বিস্কুট খেয়ে কাটছে দিন। সন্তানদের কথা মনে পড়ে না? এই প্রশ্নের উত্তরে চোখের কোণে জমা জল মুছে মায়েদের বক্তব্য, নিজের সন্তানকে কেউ ভুলতে পারে না। ওরা থাকলে আজ হয়তো আমরা রাস্তায় থাকতাম না।

- Advertisement -