অনুপ্রেরক সেলিনা, স্টিয়ারিং হাতে অ্যাম্বুলেন্স ছোটান শিখা-সুধারা

68

হেমতাবাদ: শুরুতে অনেকেই দেখে নাক সিঁটকেছেন। এমএ পাস করে মেয়ে কিনা ড্রাইভার। কিন্তু সেই কথা কানে তোলেননি। বাড়িতে অসুস্থ বাবা, মা। জীবিকার তাগিদে এক ফোনে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটে যেতেন তিনি। রোগীদের পৌঁছে দিয়ে আসেন হাসপাতালে। তিনি উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদের ঠুনঠুনি গ্রামের বছর আঠাশের সেলিনা বেগম। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাঁকে কুর্নিশ। কেননা, সেলিনা আজ অসামান্য নন। তিনি অনুপ্রেরক। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে অ্যাম্বুলেন্সের স্টিয়ারিং হাতে সাবলম্বী হয়ে উঠেছেন শিখা, সুধা, বিপুলা সহ পাঁচ মহিলা।

অসুস্থ বাবা মায়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে বছর তিনেক আগে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সেলিনা। দিন হোক বা রাত। রোগীর পরিজনদের তরফে ফোন পেতেই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটে যান তিনি। তার কথায়, ‘বাড়িতে বাবা মা অসুস্থ। তাই অ্যাম্বুলেন্স তো চালাতেই হবে। ভাইরাসের ভয়ে তো আমার ঘরে বসে থাকার কোনও উপায় নেই।’ উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদ ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মহিলা অ্যাম্বুলেন্স চালক সেলিনা বেগম। যে গ্রামে সেলিনার জন্ম সেখানে বছর কয়েক আগেও মেয়েরা সাইকেল চালালে লোকে ভ্রু কুঁচকাত। এমন রক্ষনশীল সমাজে এক গ্রাম্য তরুণীর অ্যাম্বুলেন্স চালক হয়ে ওঠাটা সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয়।

- Advertisement -

হেমতাবাদের বাসিন্দা আশি ছুঁইছুঁই দিনমজুর নাজিরুদ্দিন আহমেদের আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ সেলিনা বেগম। অভাবী সংসারে দুবেলা পেটপুরে ভাত জোটেনি কতদিন! হাজারো বাধার দুর্গম পাহাড় ঠেলে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেয়েছেন। কিন্তু সরকারি চাকরি জোটাতে পারেননি। একে একে বসেছেন গ্রুপ ডি, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, সিআরপিএফ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, এমনকী প্রাথমিকের পরীক্ষাতেও। কিন্তু ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি। এরপরেই পাড়ার কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে স্বর্ণজয়ন্তী দল গড়েন। বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখভালের জন্য প্রাইভেট টিউশন শুরু করেন। বড় দিদি কোহিনুর বেগম হেমতাবাদ বাজারে দর্জির কাজ করেন। দুই বোনের এই সামান্য উপার্জনে চার-চারটি পেট চালাতে হিমশিম। ২০১৮ সালে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে যখন সুযোগ এল অ্যাম্বুলেন্স চালক হওয়ার, এক মুহূর্ত ভাবেননি। সমস্ত বাঁকা চোখ উপেক্ষা করে সরকারি উদ্যোগে ট্রেনিং নিয়ে সেলিনা এখন অ্যাম্বুলেন্স চালক। মানুষকে ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা দেওয়ার জন্য হেমতাবাদ ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি ছোট্ট ঘরে বরদিদিকে নিয়ে মাথা গুঁজেছেন তিনি। উপার্জন বিশেষ নয়, তবু অ্যাম্বুলেন্সের স্টিয়ারিং হাতে মানুষের জীবন বাঁচাতে তৎপর সেলিনা। গর্ভবতী মায়েদের হাসপাতালে পৌঁছে আলো ফোটান নবজাতকের চোখে।

শুধু সেলিনাই নন রায়গঞ্জ ব্লকের মহিলা অ্যাম্বুলেন্স চালকদের তালিকায় রয়েছেন শিখা কাচুয়া, বিপুলা বর্মন, সুধা বর্মন সহ মোট পাঁচজন জানালেন, জেলা গ্রাম উন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিক সুদেষ্ণা মিত্র। সেলিনা বেগম বলেন, ‘শুরুটা অত সহজ ছিল না। কিন্তু দমে যায়নি। তাই সফল হয়েছি। উত্তরবঙ্গ সংবাদের তরফ থেকে আমাকে একাধিকবার তুলে ধরা হয়েছে। সেই কারণে উত্তরবঙ্গ সংবাদকে আমি কুর্ণিশ জানাই। এখন আমার দেখাদেখি উত্তর দিনাজপুর জেলায় পাঁচজন মহিলা এই কাজে যুক্ত হয়েছে।’ এরা প্রত্যেকেই দিনরাত ছুটে বেড়ান শহর ও শহরতলী এলাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। কোনও প্রতিকূলতায় তাদের দমাতে পারেনি। তাই নারী দিবসের দিনে আসল নারী তারাই।