কাজ আর অবসর মিলিয়ে দিতে পারে পাহাড়

নিউজ ব্যুরো : বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় সুভাষ চক্রবর্তীর একটি স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, যার একটি অংশ ছিল, কাজের সঙ্গে খেলতে চাই। কিন্তু বাস্তবে এমন ধারণার প্রয়োগ ততটা সহজ ছিল না। অন্তত কয়েক মাস আগে পর্যন্ত নয়। এখন ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এর জমানায় কাজের সঙ্গে বিনোদনের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। আনলক-১ পর্বে হোটেল-রিসর্ট চালু হওয়ার পর যাঁরা সচ্ছল তাঁরা এই সুযোগ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন। কেউ কেউ কয়েকদিনের জন্য যাচ্ছেন, অনেকে যাচ্ছেন এক মাসের বেশি সময় কাটাতে। বেশিরভাগই এমন জায়গা পছন্দ করছেন, বাড়ি থেকে যার দূরত্ব বেশি নয়, গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় এবং যেখানে ট্রেকিং, মাছ ধরা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধা রয়েছে। অবশ্যই সেখানকার আবহাওয়া ভালো হতে হবে। ইংরেজিতে এমন গন্তব্যকে বলা হচ্ছে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরল, উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রদেশের মতো রাজ্যে সহজেই এমন গন্তব্যের খোঁজ পাওয়া যায়। সেখানে এমনভাবে স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে যাতে পর্যটকরা যেতে পারেন। তবে পর্যটকরা কনটেনমেন্ট জোন থেকে আসছেন কি না, তা দেখা হচ্ছে। এছাড়া শারীরিক অবস্থা এবং ট্রাভেল হিস্ট্রি সম্পর্কে তথ্য দিতে হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গে পাহাড় থেকে ডুয়ার্সের অর্থনীতি অনেকটা নির্ভর করে আছে পর্যটন ব্যবসার ওপর। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্সিয়াংয়ে পাহাড়ি এলাকা এবং তিস্তা থেকে সংকোশ পর্যন্ত জঙ্গল-পাহাড়-চা বাগানকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা হোটেল, রিসর্ট ও হোমস্টেগুলিকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গে পর্যটনের বিকাশ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই পর্যটন বাণিজ্যের ওপর লক্ষ লক্ষ মানুষের রুজি নির্ভর করে। এই পরিস্থিতিতে পর্যটনশিল্পে ত্রাতা হিসেবে উঠে আসছে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন। তবে ডুয়ার্স এবং পাহাড়ে এমন ডেস্টিনেশন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা আছে। পর্যটনমন্ত্রী থেকে পর্যটন ব্যবসায়ীরা সকলেই মেনে নিচ্ছেন- যোগাযোগের রাস্তা, বিদ্যুৎ পরিষেবা আর অবশ্যই ইন্টারনেট পরিষেবা এমন ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনের জন্য বাধ্যতামূলক। তা ছাড়া পাহাড়ের নামী হোটেল, চা বাগান গোষ্ঠীর রিসর্ট বা সরকারি টুরিস্ট লজের কর্মীদের এমন পর্যটকদের পরিষেবা দেওয়ার মতো প্রশিক্ষণ থাকলেও হোমস্টেগুলিতে সমস্যা রয়েছে।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গের পর্যটনে এখনও সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম দার্জিলিং। তাকে কেন্দ্র করে কালিম্পং, কার্সিয়াং থেকে এখন লাভা, লোলেগাঁও, সামতাহারের মতো নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের লাগোয়া এলাকা বা বিজনবাড়ি, কোলবংয়ের মতো সান্দাকফুর রুটে অখ্যাত জায়গাও দেশ-বিদেশের পর্যটন মানচিত্রে চলে এসেছে। আবার তাকদা, তিনচুলে, লামাহাটার মতো নতুন জায়গাও এখন পর্যটনের হটস্পট। এসব জায়গায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কোনওদিনই প্রশ্ন ছিল না। সন্দেহ ছিল পরিষেবা নিয়ে। দার্জিলিং, কার্সিয়াং, কালিম্পং, লাভায় সরকারি টুরিস্ট লজ বা পাহাড়ের গ্লেনবার্ন, আম্বুটিয়ার মতো চা বাগানে তৈরি হওয়া টি টুরিজমের ক্ষেত্রে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনে এলে সেই মানের পরিষেবা দেওয়া সম্ভব। দার্জিলিংয়ে কিছু স্টার ক্যাটিগোরির হোটেলে তো সেই পরিকাঠামো তৈরি আছে আগে থেকেই। কিছু হোমস্টে স্টার ক্যাটিগোরির পরিষেবা দেওয়ার দাবি করছে। সব মিলিয়ে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন হয়ে ওঠার জন্য পাহাড় যে অনেকটা তৈরি, তার ইঙ্গিত মিলছে। তবে, ৩১ জুলাইয়ে আগে পাহাড়ে পর্যটনে নিষেধাজ্ঞা থাকছে। জিটিএ-র চেয়ারম্যান অনীত থাপা পর্যটকদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার আবেদন জানিয়েছেন।

রংলি রংলিয়ট হোমস্টে অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি নরবু জি লামা জানাচ্ছেন, ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনের জন্য তাঁরা অনেকটাই তৈরি। তিনি বলেন, পাহাড়ে তাকদা, রংলি, মংপু, তিনচুলে, লামাহাটার মতো জায়গাতেই এখন ইন্টারনেটের সমস্যা নেই। কিছুদিন আগেই অপটিক্যাল ফাইবার বসানোয় এখন শহরের থেকেও ভালো ইন্টারনেট পরিষেবা পাওয়া যায়। আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি, কোভিড পরিস্থিতিতে মেডিটেশন, যোগের পাশাপাশি কাজ করার আদর্শ জায়গা হবে দার্জিলিং পাহাড়। ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন চালু করার ব্যাপারে আমরা শুক্রবার স্থানীয় মানুষ ও সংগঠনগুলিকে নিয়ে বৈঠকে বসছি। সকলকে স্বাগত জানাচ্ছি।

কিন্তু, কর্পোরেট কালচারের টুরিস্টকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য হোটেলের মতো প্রশিক্ষিত কর্মী কি হোমস্টেগুলোতে পাওয়া যাবে? কার্সিয়াংয়ের এক হোমস্টের মালিক প্রেক্ষা শর্মা বলেন, হোটেলের মতো স্টার ক্যাটিগোরিতে হোমস্টেগুলির মান মাপা যায় না। তবে দুই-তিন তারা হোটেলের মতো পরিষেবা দেওয়ার মতো কয়েকটা হোমস্টে পাহাড়ে আছে। দার্জিলিংয়ে এক নামী হোটেলের ম্যানেজার কাঞ্চন বিশ্বাস বলেন, স্থানীয় কিছু সমস্যার জন্য এখনও হোটেল খোলা যায়নি। তবে, এখানে বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। আমাদের মতো হোটেলে জেনারেটর আছে। তাছাড়া ইন্টারনেটের সমস্যা হলে আমাদের হোটেল থেকে টেকনিকাল সাপোর্ট দেওয়ার মতো ইঞ্জিনিয়ার আছেন। হোমস্টে-তে এই পর্যায়ে পরিষেবা দেওয়া যে সম্ভব নয়, সেটা নামী হোটেল মালিকদের অনেকে মনে করছেন।

শিলিগুড়ির পর্যটন ব্যবসায়ী পার্থ গুহ পাহাড়ে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী। তিনি বলেন, পাহাড়ে অনেকে আসতে চাইছেন। কিন্তু করোনা আতঙ্ক থেকে সমাজ মুক্ত হতে পারেনি, তাই কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।