রাজ্যে পদ্ম ফোটাতে ভরসা অঙ্ক-জানা মুকুলই

640

পুলকেশ ঘোষ ও প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, কলকাতা ও নয়াদিল্লি : রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে মুকুল রায়ের সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে আসরে নামল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী সপ্তাহের শেষে মুকুল রায়কে দিল্লিতে জরুরি তলব করেছে শীর্ষ নেতৃত্ব। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতস্তরে মুকুলের দাবিদাওয়া, ক্ষোভ ও বক্তব্য শোনাই এর উদ্দেশ্য। ওই বৈঠকে কৈলাস বিজয়বর্গীয়, অরবিন্দ মেনন ও শিবপ্রকাশের পাশাপাশি দলের সভাপতি জেপি নাড্ডাও থাকতে পারেন। সম্প্রতি দিল্লিতে বিজেপির বৈঠক ছেড়ে মুকুল রায়-এর আচমকা রাজ্যে ফিরে আসা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোরদার আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুযুধান দুই পক্ষ তৃণমূল ও বিজেপি ঘর গোছানো শুরু করেছে। ইতিমধ্যে দলের ক্ষোভবিক্ষোভ ও দুর্বলতা বুজিয়ে আক্রমণকে ধারালো করতে তরুণ প্রজন্মকে সামনের সারিতে এনে দলকে আগাপাশতলা বদলে ফেলেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনের আগে তৃণমূলের ঘর ভাঙার খেলা যে বিজেপি ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে, তা ২১ জুলাইয়ে ভাষণেই জানিয়ে দিয়েছেন মমতা। তৃণমূলের ঘর ভাঙার সম্ভাবনায় সিলমোহর দিয়ে কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান রীতিমতো পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছেন, জানুয়ারি মাসেই তৃণমূল থেকে ১০ জন মন্ত্রী সহ ১০০ বিধায়ক বেরিয়ে আসবেন। সবাই জানেন, তৃণমূল থেকে ভাঙিয়ে দল ভারি করার ক্ষমতা একমাত্র মুকুল রায়ই রাখেন। তৃণমূলের একদা সেকেন্ড ইন কমান্ড-কে কেন্দ্রীয় নেতত্ব এই কারণেই বিজেপিতে এনেছিলেন। তিনি যোগ দেওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত রাজ্যে যত নির্বাচন হয়েছে, সবকটিরই দাযিত্বভার তাঁকেই সামলাতে দেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে তাঁর সঙ্গে রাজ্য নেতত্বের সংঘাতের দিকে সবসময় পর্যবেক্ষকদের কড়া নজর থাকছে।

দিল্লিতে এবার যে বৈঠক ডাকা হয়েছে, তা কিন্তু অমিত শা বা জেপি নাড্ডার নির্দেশে নয়। এই বৈঠকের মূল উদ্যোক্তা সাংগঠনিক নেতা শিবপ্রকাশ। এক একদিনের বৈঠক এক একজনের বাড়িতে হচ্ছে। জানা গিয়েছে, এবারের বৈঠকে রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের অনুগামীরাই মূলত ডাক পেয়েছেন। বিজেপির একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের প্রথম দিনেই কৈলাস বিজয়বর্গীয় একটি রিপোর্ট পেশ করেন।

- Advertisement -

যাতে বলা হয়েছে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৯০টি বিজেপি পাবে। কিন্তু এই রিপোর্টের সঙ্গে সহমত হতে পারেননি মুকুল। পোড় খাওয়া এই রাজনীতিবিদ সাফ বলে দিয়েছেন, বুথ পর্যায়ে হিসেব না কষে এভাবে আন্দাজে পশ্চিমবঙ্গের আসন সংখ্যার হিসেব কষা যায় না। কিন্তু বৈঠকে হাজির বাকি সদস্যরা মুকুলের সঙ্গে এক মত না হয়ে ওই রিপোর্টকেই গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছেন। দিলীপ ঘোষের সঙ্গে মুকুলের সম্পর্ক কোনওকালেই সহজ ছিল না। তাঁর হাত ধরে আসা গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাই রাজ্য কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেও মুকুলকে রাজ্যে কোনও পদেই রাখা হয়নি। আবার তাঁকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হলেও তার বাইরে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুকুল বুঝে গিয়েছিলেন, ওই বৈঠকে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করার মতো কোমরের জোর তাঁর নেই। তাই তিনি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এর পাশাপাশি তাঁর দিল্লির ১৮১ নম্বর সাউথ অ্যাভিনিউয়ের বাড়ি থেকে আচমকা নরেন্দ্র মোদি সহ দলের শীর্ষ নেতত্বের পোস্টারগুলি দেয়াল থেকে উধাও হয়ে যাওয়ায় জল্পনা অনেকদূর গড়িয়েছে। এমনকি তাঁর সঙ্গে তৃণমূলের পুরোনো সহযোদ্ধারা যোগাযোগ রেখে চলেছেন, এরকম খবরও রাজধানীর বাতাসে ভাসছে।

শুধু বৈঠকে মতপার্থক্যের জন্য অভিমান করে ফিরে আসার মতো কাঁচা রাজনীতিবিদ মুকুল নন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এরাজ্যে ভোটে জিততে গেলে মেশিনারি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হিসেবে অনিল বিশ্বাস বুথওয়াড়ি অঙ্কে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তার জোরেই সিপিএম বহু আগেই জনসমর্থন হারালেও পাক্কা ৩৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। মুকুল সেই বুথওয়াড়ি অঙ্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেই সিপিএমকে ভোটের লড়াইয়ে হারাতে পেরেছিলেন। তৃণমূলে আর কেউ এই অঙ্কে পারদর্শী নয় বলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ২০১৯-এর বিপর্যয়ে পর প্রশান্ত কিশোরের সাহায্য নিতে হয়েে। এই মুহূর্তে রাজ্য বিজেপিতে এই অঙ্ক জানা লোক তেমন কেউ নেই। আর তাই মুকুলের সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারে বিজেপির মূল চালিকাশক্তি আরএসএস বিশেষভাবে উৎসাহী। রাজ্য বিজেপির কাছে তেমন কলকে না পেলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা যে মুকুলকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন, তা তাঁদের কাজকর্মে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন। শ্যামাপ্রসাদের নামে কলকাতা বন্দরের নামকরণ করার সময় প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় নেমেই আলাদাভাবে মুকুলকে ডেকে কথা বলে তাঁর গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন। প্রথম ভার্চুয়াল জনসভায় তাঁর আগে মুকুলকে বলতে দিয়ে অমিত শা তাঁর গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন। বিজেপির একটি সূত্রের খবর, ২০২১ সালের নির্বাচনেও মুকুলকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে। অগাস্ট মাসেই অমিত শা কোনও নতুন ঘোষণা করতে পারেন। তবে তা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব নাকি কোনও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ, তা অবশ্য পরিষ্কার নয়। আর সেই প্রতিশ্রুতির জোরেই আপাতত দিল্লির সভায় না থেকে বিতর্ক এড়িয়ে চোখ দেখানোর জন্য ফিরে এসেছেন তিনি। কারণ, দাযিত্ব পেলে তাঁকেই যখন কাজ করতে হবে তখন শুকনো বিতর্কে ঢুকতে চাননি তিনি।

এই মুহূর্তে বিজেপির রাজ্য নেতত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর হাত ধরে আসা সব্যসাচী দত্ত, সৌমিত্র খাঁ, ভারতী ঘোষ, দুলাল বর ও অর্জুন সিং। ২১-এর আগে তৃণমূল দল ভেঙে আরও অনেককে বিজেপিতে যোগদান করানোর মাস্টার স্ট্রোক দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন তিনি। যদিও বিজেপির একটি মহলের মতে, মণিরুল ইসলাম সহ তাঁর হাত ধরে যোগদান করা বহু জনকে নিয়ে বিজেপিকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে বেশকিছু পুরসভা বিজেপির দিকে নিয়ে এসে প্রাথমিকভাবে চমক দিলেও, তা ধরে রাখতে পারেননি মুকুল। তবু ভোটের অঙ্ক জানা মুকুলকে এই মুহূর্তে চটানোর অর্থ তৃণমূলের হাত শক্ত করা, তা বিজেপির ওই মহল মানছেন। সারদা মামলার চার্জশিটে মুকুলের নাম না থাকলে ২১-এর নির্বাচনে তিনিই বিজেপির নির্বাচন পরিচালনায় মুখ্য ভমিকা নেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।