বরাত মেলেনি, তবু ডাকের অপেক্ষায় ঊষাহরণ গ্রামের ঢাকিরা

সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি : করোনা আবহে এবার মন ভার ঊষাহরণ গ্রামের ঢাকিপাড়ায়। কুশমণ্ডি ব্লকের আকচা পঞ্চায়েতের কালিয়াগঞ্জ থেকে ইটাহারে যাওয়ার রাস্তায় ছোট্ট গ্রাম ঊষাহরণ। এখানে বৈশ্য সম্প্রদায়ে অধিবাসীদের বসতভিটে ছাড়া আবাদি জমি নেই একজনেরও। সকলেই শিল্পী।

শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে। নিজের জাতের পেশাকে নিয়ে প্রায় জনমানবহীন ঊষাহরণ গ্রামে যাত্রা শুরু করেছিলেন প্রয়াত সুদন বৈশ্য। সময়ে সঙ্গে ঊষাহরণ বৈশ্যপাড়ার পরিধি বেড়েছে। বর্তমানে এখানে ৬০টি বৈশ্য পরিবারের বসবাস। বাঁশ কেটে ঝাঁটা, কুলো, খৈচালা থেকে শুরু করে হাল আমলে নানা হাতের কাজের সঙ্গে যুক্ত সকলেই। তবে পুজো এলেই বৈশ্য পরিবারগুলি মেতে ওঠে ঢাক, ঢোল আর সানাই নিয়ে। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, মালদা, বালুরঘাট এমনকি দিল্লি পর্যন্ত দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজিয়ে আসার অভিজ্ঞতা আছে গোপাল বৈশ্য, সুকুমার বৈশ্য, জগা বৈশ্য, পল্টু বৈশ্য, বরেন বৈশ্য, চঞ্চল বৈশ্যদের।

- Advertisement -

পরিবারের ছোট-বড় সব ছেলেরা ঢাক, ঢোল, সানাই সহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যান জীবিকার তাগিদে। কিন্তু এ বছর করোনা আবহের কারণে ঊষাহরণ ঢাকিপাড়ায় কারও কাছেই পুজোয় ঢাক বাজানোর বায়না আসেনি। আর দুদিন বাদেই মহালয়ার আগমনী সুরে দুর্গাপুজোর সূচনা হবে। প্রতিবছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন ঊষাহরণের ঢাকিরা। এ বছর সংক্রমণের কারণে এখনও অবধি বায়না আসেনি। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই কোথাও একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে ঊষাহরণ ঢাকিপাড়ায়। বাইরে থেকে যা বোঝার উপায় নেই। এখন তাই শুধু সময়ে অপেক্ষা, কখন ডাক আসে। আর সেইদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন ঊষাহরণ গ্রামের ঢাকি পরিবারের সকলে।

পুজোয় ঢাক বাজিয়ে চার থেকে পাঁচ জনের দল তৈরি করে ২৫ হাজার টাকা পান বরেন বৈশ্য। এছাড়াও বকশিশ থাকে। বেশি যন্ত্রী হলে রেটও বেড়ে যায়। ঢাক বাজানো শুরু হয় বিশ্বকর্মাপুজো থেকে। কিন্তু এ বছর শিলিগুড়ি, কলকাতা, মালদা, কিংবা রায়গঞ্জ থেকে পুজোয় ঢাক বাজাবার ডাক পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন সকলেই। কুশমণ্ডি, কালিয়াগঞ্জ, ইটাহার, হরিরামপুর, বুনিয়াদপুর এলাকাগুলিতে দুর্গাপুজোর সংখ্যা নেহাত কম নয়। পল্টু বৈশ্য বলেন, দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজিয়ে পরিবারের সবার নতুন জামাকাপড় হয় না বললেই চলে। দুর্গাপুজোয় যে টাকা পাওয়া যায় সেই তুলনায় কালীপুজোয় রোজগার হয় বেশি। এ বছর পরিবারের সবাইকে নতুন জামা দিতে পারব কি না জানি না।

জগা বৈশ্য বলেন, বায়না না এলেও সন্ধে হলেই সবাই এক জায়গায় বসে ঢাক বাজিয়ে নিচ্ছি। সেখানে ঢাক বাজাতে বাজাতেই পুজো থেকে শুরু করে করোনা, সব কিছু নিয়ে আলোচনা হয়। এ বছর যদি কিছু বায়না আসেও তবু টাকার পরিমাণ অনেক কমে যাবে। বায়না পেলে মাস্ক পরে আর দূরত্ববিধি মেনেই আমরা মণ্ডপে থাকব। তবে অন্য বছরের মতো এবারের পুজোটা আর সেরকম আনন্দের হবে বলে মনে হয় না।