বন্ধ রেডব্যাংকে পুজোর ভার তুলে নিয়েছেন মহম্মদ দুলাল

235

শুভজি দত্ত  নাগরাকাটা : অভাব এখানে অন্তহীন। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়তই লড়াই করতে হয় দারিদ্রের সঙ্গে। এমন পরিস্থিতিতে মহম্মদ দুলাল নামে এক শ্রমিকের কাজ যেন বন্ধ রেডব্যাংক চা বাগানের অমানিশায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল আলো। বছরের পর বছর ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের দুলালের হাতেই পূজিত হয়ে আসছেন এক সময়ে বৈভবে ভরা মালিকের তালাবন্ধ বাংলোর মন্দিরের দেবদেবী। পাশাপাশি তিনি নিয়ম করে নমাজ আদায় করেন পাশের ডায়না চা বাগানের মসজিদে গিয়ে। জাতিধর্মের কচকচানি কোনদিনও গায়ে না মাখা স্বভাব সরল দুলাল বলছেন, সব ধর্মের মূল কথাই এক। মন্দির-মসজিদ দুই স্থানেই সর্বশক্তিমানের অধিষ্ঠান। তাই পুজো কিংবা নমাজ আদায় যেটাই করি না কেন, মন দিয়ে করার চেষ্টা করি। রেডব্যাংকে তিনি রয়েছেন গত ৪০ বছর ধরে। ৮ বছর বয়সে তাঁর ওই বাগানে আসা। বড় হওয়ার পর কাজ ছিল মালিকের রান্না করে দেওযার। গত দশ বছর আগে বাগানটিতে তালা ঝোলার পর থেকে বাংলোর কুলদেবতার মন্দিরও পুরোহিত শূন্য হয়ে পড়ে। যিনি পুজোপাঠের কাজ করতেন, তিনিও বাগান ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে কালী-কৃষ্ণের আরাধনার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন দুলাল। পোষা দুটি গোরুর দুধ বিক্রি করে যা আয়, তাই দিয়ে খরচ চালান নিত্যপুজোর। অমাবস্যার কালীপুজো কিংবা জন্মষ্টমীর মতো বিশেষ দিনগুলিতে ভোগও দেন নিজের হাতে রান্না করেই। এভাবেই চলছে এক দশক ধরে। এরই ফাঁকে নিজের ধর্মচারণ করতেও ভুলে যান না কখনোই। প্রতিবছর রমজান মাসে নিয়ম করে রোজা রাখেন। মসজিদে গিয়ে নমাজ আদায় করেন জগৎ সংসারের সুখ-শান্তির কামনায়।

মহম্মদ দুলাল অকৃতদার। তাঁর আদি বাড়ি ময়নাগুড়িতে। সেখানে আত্মীয়স্বজনরা থাকেন। মালিকের বাংলোর পাশেই এক চিলতে ভাঙাচোরা ঘরে তাঁর একার সংসার। নিরিবিলি ওই চত্বরে তিনি ছাড়া আর মাত্র দুটি পরিবার রয়েছে। তাও হাতির উৎপাতের জন্য ওই দুই পরিবারও অন্যত্র বাড়ি বানিয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। বাগান বন্ধ থাকায় স্থাযী আয়ের কোনও উপায় নেই। বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা একশো দিনের কাজ, দু টাকা কিলোর সরকারি র‌্যাশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওযা বিশেষ ত্রাণ। নিজের অভাব অবশ্য মুখ ফুটে বলতে চান না। তবে অযত্নে বেড়ে ওঠা বাগানের ঝোপে ডেরা বাঁধা চিতাবাঘ তাঁর একটি পোয়াতি গোরুকে খেয়ে ফেলেছে সম্প্রতি। তা নিয়ে আক্ষেপের অন্ত নেই পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই দুলালের। তিনি বলেন, ওই গোরুটি বেশ ভালোই দুধ দিত। ফলে পুজোর খরচ জোগাড়ে খুব একটা অসুবিধে হত না। এখন খুব সমস্যায় পড়েছি।

- Advertisement -

তিনি বলেন, স্নান করে পূজার্চনার পর তবেই নিজের জন্য রান্না চাপাই। যদি কোনও মাসে কিছু টাকা বাঁচাতে পারি, তবে গ্রামের বাড়িতে দাদার ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু পাঠাই। সম্প্রতি ওই বাগানটি পরিদর্শনে এসেছিলেন জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের কর্তারা। সভাধিপতি উত্তরা বর্মন ও সহকারী সভাধিপতি দুলাল দেবনাথ মালিকের বন্ধ বাংলো দেখতে এসে দুলালের কথা শুনতে পেয়ে খানিকটা অবাকই হয়ে যান। সহকারী সভাধিপতি দুলাল দেবনাথ বলেন, এই দুলালই হল সমাজের আসল হিরো। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করতে সবার অগোচরে উনি যা করছেন তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। তাঁকে কুর্নিশ জানাই। বাগানের সুশীল সরকার নামে এক বাবুস্টাফ বলেন, মহম্মদ দুলাল গোটা বাগানের গর্ব।