হরিজনদের পুজোয় এগিয়ে আসেন মুসলিমরা

- Advertisement -

জসিমউদ্দিন আহম্মদ, মালদা : দেশের অনেক জায়গাতেই যখন ধর্মীয় বিদ্বেষ দেখা যাচ্ছে, সেখানে আজান আর শঙ্খধ্বনিতে অন্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন মালদার পিরোজপুর গাজোল ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এলাকার মানুষ। তাঁদের একটা বড় দুঃখ ছিল, দুর্গাপুজোয় তাঁরা অঞ্জলি দিতে পারতেন না। কারণ তাঁরা দলিত সম্প্রদায়ে মানুষ। দুর্গাপুজোর আনন্দে যখন মালদা শহর মাতোয়ারা হয়ে থাকত, তখন স্ট্যান্ড এলাকা অনেকটাই প্রদীপের নীচের অন্ধকারের মতো থেকে যেত আড়ালে। দলিত সম্প্রদায়ে এই মানুষজনের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে আসেন স্থানীয় মুসলিমরা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয় হিন্দুরাও। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় এলাকায় দুর্গাপুজো শুরু হয়। আর এই পুজো কমিটির সম্পাদক হন স্থানীয় যুবক ববি আহমেদ। সভাপতি হন অজিত ঘোষ। পুজো কমিটিতে রয়েছেন দলিত সম্প্রদায়ে মানুষজনও। প্রায় ১৩ বছর ধরে সম্প্রীতির এই নজির তৈরি করে চলেছে মালদা ঐক্য সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি।

মালদা শহরের গাজোল ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এলাকায় মিশ্র সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। রয়েছেন হিন্দু, মুসলমান সম্প্রদায়ে মানুষজন। রয়েছেন দেড় শতাধিক হরিজনও। ২০০৭ সালে এই এলাকায় প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়। স্বল্প বাজেটে সীমিত সাধ্যের মধ্যেও শহরবাসীকে সৃজনশীল পুজো উপহার দিয়ে থাকে এই পুজো কমিটি। গত ১৩ বছরে বিভিন্ন সংস্থার তরফে ২২টি শারদসম্মান তাদের ঝুলিতে এসেছে। সবাই মিলে একজোট হয়ে দুর্গাপুজোর এই ঐতিহ্য ববি, অজিত, ধীরজদের কাছে একটা গর্বের বিষয়। পুজো কমিটির সম্পাদক ববি আহমেদ বলেন, আমাদের এলাকায় হিন্দু, মুসলমান এবং হরিজন সম্প্রদায়ে বহু মানুষ থাকেন। দেশের বহু জায়গায় যেখানে জাতি ও ধর্মীয় বিদ্বেষের দূষিত আবহ চলছে, সেই দূষিত হাওয়া আমাদের ঐক্যকে টলাতে পারেনি। আমরা আগাগোড়া একসঙ্গেই কালীপুজো, শনিদেবের পুজো, ইদ, মহরম করে এসেছি। তবে আমাদের একটা দুঃখ থেকে গিয়েছিল, এই এলাকায় দুর্গাপুজোর আয়োজন হত না। পুজোর আনন্দে গোটা শহর যখন সেজে উঠত, তখন আমাদের এলাকা থাকত অন্ধকারে।

তিনি বলেন, একদিন এলাকার হরিজন ভাইরা আমাকে জানান, তাঁরা দলিত বলে দুর্গাপুজোয় অঞ্জলি দিতে পারেন না। এই এলাকায় দুর্গাপুজো হলে তাঁদের সাধ পূরণ হবে। তাঁরাও দুর্গাপুজোয় শামিল হতে পারবেন। এরপর আমরা সবাই মিলে আলোচনায় বসি। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আমরাও দুর্গাপুজো করব। সবাইকে নিয়ে একটা পুজো কমিটি গড়ে তোলা হয়। নাম দেওয়া হয় মালদা ঐক্য সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি। পুজোর উদ্যোক্তা ধীরজ হরিজন বলেন, আমরা দুর্গাপুজোয় কখনও অঞ্জলি দিতে পারতাম না। আমরা মানুষের আবর্জনা সাফাই করে সংসার চালাই। কিন্তু আমাদেরও আনন্দ বলে কিছু আছে। এই এলাকায় দুর্গাপুজো হলে আমরা সবাই প্রত্যক্ষভাবে শামিল হতে পারব। আমাদের মনের কথা একদিন ববিদাকে খুলে বলি। তিনি আমাদের পাশে দাঁড়ান। তাঁর চেষ্টায় এলাকার হিন্দু, মুসলমান ও হরিজনরা একত্রিত হন। শুরু হয় দুর্গাপুজো। এটা আমাদের কাছে গর্বের।

পুজো কমিটির সম্পাদক অজিত ঘোষ বলেন, আমাদের মধ্যে জাতিবিদ্বেষ বলে কিছু নেই। ছোট থেকেই আমরা সেইভাবে মানুষ হয়েছি। বাংলার সংস্কৃতিই আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। কোনও অশুভ শক্তি আমাদের এই ঐক্য ভাঙতে পারবে না। করোনা আবহে সংক্রমণ এড়াতে এবারের পুজো আমরা সাদামাটাভাবে করব, যাতে মণ্ডপে বেশি ভিড় না জমে। মণ্ডপের প্রবেশদ্বারে স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা থাকবে। কারও মুখে মাস্ক না থাকলে পুজো কমিটির তরফেই মাস্ক দেওয়া হবে।

- Advertisement -