লন্ঠনের আলোয় মাকে পথ দেখালেন মুসলিমরা

বাপিকুমার দাস, চাঁচল : প্রায় সাড়ে ৩৫০ বছরের পুরোনো প্রথা। তা মেনেই আজও বিদায় জানানো হয় মা দুর্গাকে। বিদায়বেলায় দেবীকে লন্ঠনের বাতির আলো দেখিয়ে বিদায় জানান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে মানুষরা। গোটা দেশ জুড়ে যখন সাম্প্রদায়িক হানাহানি ক্রমশ বেড়েই চলেছে, সেখানে এই প্রাচীন রীতি আরও মজবুত করে তোলে সম্প্রীতিকে।

এমন ছবি দেখতে পাওয়া যায় চাঁচলের মরা মহানন্দা নদীর তীরে। চাঁচল পাহাড়পুরের চণ্ডীপুজো চাঁচলবাসীর কাছে মূলত রাজবাড়ির পুজো হিসাবেই পরিচিত। রাজবাড়ির এই দেবী দুর্গা চণ্ডীরূপে পূজিতা হন। দেবীর এখানে চার হাত। যদিও বর্তমানে না রয়েছে রাজা, না রয়েছে রাজত্ব। কিন্তু রয়ে গিয়েছে রাজ আমলের প্রবর্তিত রীতি। আর সেই রীতি মেনেই দশমীর দিন গোধূলিবেলায় মন্দিরের সামনে ঠিক ২০০ মিটার দূরে মরা মহানন্দায় বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমাকে। আর নদীর ওই পাড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ লন্ঠনের আলো জ্বালিয়ে মাকে বিদায় জানান। এবারও বদল আসেনি সেই ছবিতে। কেবলমাত্র মাঝেমাঝে সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বর্ষাসুর। তবে তাও উপেক্ষা করে নিজেদের রীতি পালন করলেন বাসিন্দারা।

- Advertisement -

চাঁচল রাজবাড়ির পরিদর্শক পিনাকীজয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজবাড়ির দেবী প্রতিমা নিরঞ্জনের এই প্রথা ৩৫০ বছরের প্রাচীন। মরা মহানন্দার ওপারে রয়েছে বিদ্যানন্দপুর গ্রাম। ওই গ্রামে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ে মানুষদেরই বসবাস। বিদায়বেলায় তাঁরাই দেবীকে লন্ঠনের আলো দেখান। কথিত আছে, প্রায় ৩৫০ বছর আগে ওই গ্রামে মহামারির প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। নবমীর রাতে সেসময় ওই গ্রামের এক মুসলিম ব্যক্তি মা চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন, দশমী তিথির গোধূলিলগ্নে ওই গ্রামের মানুষজন যেন তাঁকে লন্ঠনের আলো দেখান। সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন বিদ্যানন্দপুর গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ে লোকেরা। এরপরই ওই গ্রাম থেকে মহামারি দূর হয়ে যায়। সেই থেকে আজও বিদ্যানন্দপুরের মুসলিম সম্প্রদায়ে মানুষেরা দেবীর বিসর্জনের সময় মরা মহানন্দা নদীর অপরপ্রান্তে জড়ো হয়ে লন্ঠন জ্বালিয়ে আলো দেখান।

বিদ্যানন্দপুরের বাসিন্দা মণিরউদ্দিন, আয়েষা বিবি, লুৎফর হোসেনরা বলেন, মা চণ্ডী হিন্দুদের দেবী হলেও আমরা তাঁকে যথেষ্ট ভক্তি-শ্রদ্ধা করি। দুর্গাপুজোতেও শামিল হই আমরা। পাহাড়পুরের দেবী চণ্ডী সর্বক্ষণ আমাদের সুস্থ রাখেন, বিপদ থেকে রক্ষা করেন আমাদের। দেবী বিসর্জনের সময় তাই গ্রামের প্রতিটি বাসিন্দা নদীর পাড়ে লন্ঠন জ্বালিয়ে দেবীকে আলো দেখাই। এই রীতি কয়ে পুরুষ ধরে চলে আসছে। গ্রামে এখন প্রত্যেকের বাড়িতেই বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে। লন্ঠনের ব্যবহার আর নেই বললেই চলে। তবু পুজো এলেই আমরা পুরোনো লন্ঠন পরিষ্কার করে রাখি। দশমীর দিন গোধূলিতে বিসর্জনের সময় সেই লন্ঠন জ্বালিয়ে বিদায় জানাই মাকে।