ভোটের আগে জাতি শংসাপত্র দিতে উদ্যোগী নবান্ন

310

দীপ্তিমান মুখোপাধ্যায়, কলকাতা : বিধানসভা ভোটে তপশিলি জাতি ও উপজাতি ভোটব্যাংক ফিরে পেতে আবেদনকারীর কাছে যেনতেন প্রকারেণ কাস্ট সার্টিফিকেট বা জাতি শংসাপত্র পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। এই তাড়াহুড়োর জন্য বেশ কিছু জটিলতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যা ভবিষ্যতে সরকারের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, তবে সরকার সে সব সমস্যার দিকে এখন নজর দিতে চাইছে না। সরকারের কাছে প্রধান অগ্রাধিকার, ভোটের আগেই এই কাজ শেষ করা।

গত লোকসভা ভোটে জঙ্গলমহল, মতুয়া প্রভাবিত বনগাঁ ও রানাঘাট এবং উত্তরবঙ্গে ধরাশায়ী হয়েছিল তৃণমূল। এই ১৮টি লোকসভা কেন্দ্রে গড়ে ৫৫ থেকে ৫৭ শতাংশ তপশিলি জাতি ও উপজাতি ভোটার রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরেই কাস্ট সার্টিফিকেট বা জাতি শংসাপত্র পেতে দেরি হওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। লোকসভা ভোটে ওই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল বলে রিপোর্ট দিয়েছিলেন ভোটকৌশলী প্রশান্ত কিশোর। তাই আবেদন করার ৭ দিনের মধ্যে আবেদনকারীকে কাস্ট সার্টিফিকেট দিতে হবে বলে নবান্ন প্রতিটি জেলায় নির্দেশ পাঠিয়েছে। এখন বিভিন্ন জেলায় দুয়ারে সরকার ক্যাম্প চলছে। ওই শিবির থেকে এই সার্টিফিকেট যাতে আবেদনকারী পেয়ে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে জেলা শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশের পরই প্রতিটি জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নোডাল অফিসার বিষয়টি দেখভাল শুরু করেছেন। নবান্ন সূত্রের খবর, পিকের টিম লোকসভা ভোটে তৃণমূলের বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানতে পারে, কাস্ট সার্টিফিকেট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। ওই ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছিল। এই নিয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে কাছে রিপোর্টও দেওয়া হয়। তারপরই এই নিয়ে সরকার জরুরি পদক্ষেপ করল।

- Advertisement -

যদিও সরকারি অফিসারদের একাংশ মনে করছেন, সরকারের এই নির্দেশে জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। কারণ, আবেদন করার ৭ দিনের মধ্যে সার্টিফিকেট দিতে গেলে বহু সময়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করা সম্ভব হবে না। দুয়ারে সরকার শিবিরে যেভাবে রোজ তাড়া তাড়া কাস্ট সার্টিফিকেটের আবেদন জমা পড়ছে তাতে ৭ দিনের মধ্যে সার্টিফিকেট দিতে গেলে বহু সময়ে সময়ে অভাবে কোনও তদন্ত ছাড়াই তা দিয়ে দিতে হবে। সরকারিভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পরিবারের কোনও এক সদস্যের সার্টিফিকেট থাকলেই আবেদনকারীকে নতুন কাস্ট সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু বিবাহ সম্পর্কিত কারও সার্টিফিকেট আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিলে তা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য হবে? এই নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসারদের বক্তব্য, বিনা তদন্তে কাস্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করে দেওয়া হলে আগামী দিনে ফল মারাত্মক হতে পারে। ভুয়ো সার্টিফিকেট বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রচুর পরিমাণে থাকছে। যদিও অফিসাররা এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত সাড়ে ৯ বছরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকে গিয়ে বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান নিয়ে জেলাস্তরের অফিসারদের আরও উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কাস্ট সার্টিফিকেট নিয়ে সমস্যা কাটেনি। বহু মানুষ আবেদন করেও দীর্ঘদিন ধরে কাস্ট সার্টিফিকেট পাননি। তা নিয়ে ক্ষোভ ছিলই। গত লোকসভা ভোটে উত্তরবঙ্গের ৮টি আসন, ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও আসানসোল লোকসভা কেন্দ্র তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছে। এই এলাকাগুলিতে তপশিলি জাতি ও উপজাতি ভোটারের সংখ্যা কোথাও কোথাও গড়ে ৫৫ থকে ৫৭ শতাংশ। আবার রানাঘাট ও বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্র সহ রাজ্যের ৭৬টি  বিধানসভা কেন্দ্রে মতুয়া সম্প্রদায়ে ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। মতুয়াদের ৯৫ শতাংশই তপশিলি জাতি সম্প্রদায়ের। এই অবস্থায় তাঁদের মন জয় করতে দ্রুত কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

সরকারি সূত্রের খবর, দুয়ারে সরকার ক্যাম্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার নবান্নে রিপোর্ট জমা হচ্ছে। গত শনিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই টুইট করে জানিয়েছেন, ওইদিন পর্যন্ত ২ কোটি মানুষ দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে বিভিন্ন পরিষেবা নিতে এসেছেন। শনিবার পর্যন্ত ৭ লক্ষ মানুষ জাতি শংসাপত্র পেয়েছেন বলেও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর টুইটে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এদিনই  নবান্ন থেকে প্রতিটি জেলায় নির্দেশ পাঠিয়ে বলা হয়, আবেদন করার ৭ দিনের মধ্যে শংসাপত্র দিয়ে দিতে হবে। কোনও আবেদনকারী এই সার্টিফিকেট না পেলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারকে কারণ দর্শাতে হবে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপও করা হতে পারে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এই সার্টিফিকেট ভোটের আগে যত বেশি সংখ্যক পাইয়ে দিয়ে তপশিলি জাতি ও উপজাতি ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা নবান্ন চালাচ্ছে বলেই রাজনৈতিক মহল মনে করছে। জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকের মাধ্যমে তড়িঘড়ি শংসাপত্র দেওয়ার বার্তা দেন মমতা। এমনকি ওই দপ্তরের সচিবকে সবার সামনেই ভর্ৎসনা করে তিনি বলেন, আগে জানতাম, তুমি ভালো কাজ কর। এখন আমার ধারণা পালটে গেল। তবে এক পদস্থ সরকারি আধিকারিক অবশ্য জানিয়েছেন, কেউ যদি নিজের পেশ করা তথ্য সঠিক বলে দাবি করে, তাহলে তাকে শংসাপত্র দিতে কোনও বাধা নেই। কারণ পরে তাঁর দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাঁকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।