পান বিক্রি করে নাতি-নাতনির উচ্চশিক্ষার সহায় ননীবালা

0
330
- Advertisement -

বাণীব্রত চক্রবর্তী : জাতীয় সড়কের ধারে ময়নাগুড়ি সুপার মার্কেটের সামনে গেলেই দেখা যাবে তাঁকে। সামনে ভাগা পানের বান্ডিল আর সুপারির ঝুলি। খরিদ্দারদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাসিমুখে পানের খিলি এগিয়ে দিচ্ছেন। পাশে একটা হামানদিস্তাও আছে। নিজেও পান খান। কিন্তু দাঁত নেই বলে পান ছেঁচে নেন। সঙ্গে কুচো সুপারি। যাঁদের পান খাওয়ার নেশা তাঁরা সকলেই চেনেন ননীবালা বর্মনকে। সুপার মার্কেটের ব্যবসাযীদের কাছে তিনি মাসিমা। আটপৌরে ননীবালা বর্মনকে কিন্তু কেউ কেউ বলেন, সাক্ষাৎ মা দুর্গা।

জীবনে স্কুলের চৌকাঠে পা রাখেননি তিনি। কিন্তু সত্তরোর্ধ্ব ননীবালাদেবীর তিন কলেজ পড়ুয়া নাতি-নাতনি বলেন, ঠাকুমা না থাকলে আমরা তো পড়াশোনাই করতে পারতাম না। স্কুল থেকে কলেজ, আমাদের পড়াশোনার সব খরচ তো ঠাকুমাই চালিয়ে এসেছেন। আর তা ওই ভাগা পান বিক্রি করে। কখনও মাথার ওপর গনগনে সূর্য, কখনও বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাচ্ছেন। তবু সারাবছর ধরে ময়নাগুড়ি সুপার মার্কেটের সামনে খোলা আকাশের নীচে তাঁর দোকান খোলা। দিনের শেষে যা লাভ হয় তা জমিয়ে রাখেন নাতি-নাতনিদের জন্য। তবে শর্ত একটাই, এই টাকা নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।

ময়নাগুড়ি শহরের গোবিন্দনগরের নেতাজিপাড়ার বাসিন্দা ননীবালা বর্মন। স্বামী উপেন বর্মন মারা গিয়েছেন বহু বছর আগে। ছেলে বিমল কেরলে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন। লকডাউনেও বাড়িতে আসেননি। ছেলের পাঠানো টাকায় পরিবারের খাওয়া-খরচ চলে যায় কোনওমতে। ননীবালাদেবীর বড় নাতনি স্বপ্না ময়নাগুড়ি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে বিএ পাশ করেন। তারপর স্বপ্নার বিয়ের বন্দোবস্ত করেন ঠাকুমা। আরেক নাতনি মমতা ময়নাগুড়ি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কলেজ বন্ধ থাকায় মমতা বাড়িতেই রয়েছেন বর্তমানে। নাতি উজ্জ্বল এবার ময়নাগুড়ি কলেজে বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। তিনজনেই জানালেন, লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ চালিয়েছেন এবং এখনও চালান তাঁদের ঠাকুমা।

খুব সকালে উঠে ননীবালাদেবী বাড়ির কাজকর্ম সারেন। তারপর স্নান, পুজো সেরে ঝোলায় সামগ্রী নিয়ে সোজা চলে আসেন বাজারে। বাড়ি থেকে বাজার কিছুটা দূরে। আগে ভ্যানরিকশায় করে আসতেন। এখন টোটোয় চলে আসেন। তারপর বাজারে বসে ব্যবসা করে সারাদিনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা গড়ে রোজগার হয়। মমতা বলেন, ঠাকুমা আমাদের কাছে বাবা-মায়ের মতো। ঠাকুমা এভাবে না করলে আমাদের লেখাপড়া হত না। ঠাকুমা আমাদের পরিবারে দশভুজা। আমি আর ভাই ময়নাগুড়ি কলেজে পড়ছি। দুজনের লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ চালায় ঠাকুমা। নাতি উজ্জ্বল বলেন, ঠাকুমাই আমাদের কাছে সবকিছু। পুত্রবধূ অঞ্জলি বর্মন বলেন, স্বামী কেরলে থাকেন। স্বামীর যা রোজগার তাতে সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শাশুড়ি মায়ের অবদান ভোলার নয়।

ননীবালা বর্মন বলেন, আমরা তো আর লেখাপড়া করার সুযোগ পাইনি। তাই কর্তার মৃত্যুর পর আমাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। ছেলের বিয়ের পর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে বিস্তর সমস্যা দেখা দেয়। পরে এভাবে ভাগা পান-সুপারি বিক্রি করা শুরু করি। ছেলে বিমলের রোজগারের টাকায় সংসারের খাওয়া-খরচ কোনওমতে চলে। কিন্তু নাতি-নাতনিদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এরপর আমি নাতি-নাতনিদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নিতে এই কাজ করতে থাকি। তিনি বলেন, প্রায় গত ২০ বছর ধরে এভাবেই ময়নাগুড়িতে ভাগা পান বিক্রি করছি। মমতা ও উজ্জ্বলকে বলেছি, যতদূর লেখাপড়া করতে মন চায় চালিয়ে যাও। আমি পিছনে রয়েছি। ময়নাগুড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সম্পদক ঝুলন দে জানেন ননীবালাদেবীর কথা। তিনি বলেন, এই দোকান করেই নাতি-নাতনিকে তিনি পড়িয়েছেন। আমরা একথা জানার পর ওঁকে খুবই শ্রদ্ধা করি। ময়নাগুড়ি বাজারে পান কিনতে আসা এক খরিদ্দার বললেন, সব কথা জানার পর ওঁর দোকান থেকেই পান কিনি। অন্য কারও কাছে যাই না। প্রতিদিন দেবীদর্শন হয়ে যায় আমার।

- Advertisement -