আবার জোতদারদের হাতে চলে যাচ্ছে নকশালবাড়ি

76
এভাবেই চাষের জমিতে তৈরি হচ্ছে একের পর এক বাড়ি

মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : যে চাষের জমির অধিকার চেয়ে কৃষক আন্দোলনে একসময় উত্তাল হয়ে উঠেছিল এলাকা, নকশালবাড়িতে সেই চাষের জমিতেই এখন গড়ে উঠছে একের পর এক বহুতল। একদা জোতদারদের বর্তমান বংশধরেরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাতের দশকে নকশালবাড়ি আন্দোলনের এতদিন পরেও এলাকার বহু জমি চাষিদের নামে করা হয়নি। মালিক হিসেবে খাতায়কলমে নাম রয়ে গিয়েছে জোতদারদেরই। তাঁদের বংশধরেরা এখন আবার জমির দখল নিজেদের হাতে নিয়ে তা তুলে দিচ্ছেন প্রোমোটার হাতে। না জানি কোন জাদুমন্ত্রে কৃষিজমির চরিত্র বদলে সেসব হয়ে যাচ্ছে বাস্তুজমি। গড়ে উঠছে রিয়েল এস্টেট। জমির আকাশছোঁয়া দাম এবং বহিরাগতদের  ভিড়ে একদম পিছনের সারিতে চলে গিয়েছেন নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকরা।

হাতিঘিসা রঘুজোতের বাসিন্দা খুদনলাল মল্লিক ১৯৬৩ সালে চিনে গিয়েছিলেন গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শিখতে। পরবর্তীকালে নকশাল আন্দোলনে কৃষকদের নিয়ে গেরিলাবাহিনী গঠন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন। জেলে ছিলেন ১৪ বছর। ২০১৭ সালে মারা যান। খুদনলালের সাত ছেলে। তাঁরা এখন সকলেই অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। খুদনলালের বড় ছেলে তুফান মল্লিক সারা ভারত কৃষকসভার দার্জিলিং জেলার সদস্য। তিনি জানান, বাবার আদর্শ এখন আর বেঁচে নেই। রাজ্যে পরিবর্তন হওয়ার পরেই কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, শিলিগুড়ি থেকে জোতদারদের বংশধরেরা হাতিঘিসা এলাকা থেকে জমি আবার হাতিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই এলাকায় এখন তৈরি হচ্ছে বড় বড় কমপ্লেক্স, পাকা বাড়ি। আর আমরা এখনও মাটির বাড়িতেই পড়ে আছি। বহিরাগতদের হাতেই এখন নকশালবাড়ির চাবিকাঠি।

- Advertisement -

এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নকশাল নেতা জঙ্গল সাঁওতাল। তাঁর ছেলে উপেন কিস্কুর দুই বিঘা জমি ছিল হাতিঘিসার সেবদেল্লা মৌজায়। সেই জমি ফের ছিনিয়ে নিয়েছেন সাবেক জমিদারদের বংশধররা। তিনি জানান, কানু স্যান্যাল জীবিত থাকাকালীন কেউ হাতিঘিসায় জমি দখলের চেষ্টা করেনি। ২০১১ সালে সরকারের পালাবদলের পর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে সেইসব পালিয়ে যাওয়া জোতদারের বংশধররা। লাঙল যার, জমি তার স্লোগান দিয়ে কৃষকরা জমি দখল করলেও কাগজেকলমে তা কৃষকদের নামে হস্তান্তর করেনি কোনও সরকারই। তারই সুযোগ নিয়ে এখন জমিদারদের বংশধররা পুনরায় হাতিঘিসায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

সিপিআই(এমএল)-এর প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক কানু সান্যালের অনুগামী ও সংগঠনের সদস্য দীপু হালদার জানান, যে জমিগুলিতে ধান, পাট চাষ করা হত, সেগুলিতে এখন বিত্তশালীরা তৈরি করছে বিশাল বড় বড় কমপ্লেক্স, বহুতল।  ভূমি দপ্তর, পুলিশ প্রশাসন, ব্লক প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে রোপণি জমিগুলির চরিত্র পরিবর্তন করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। এভাবে কৃষিজমির চরিত্র বদলে দেওয়া বন্ধ করার জন্য আমরা জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে নবান্ন পর্যন্ত বহুবার লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কিছু হয়নি।

নকশালবাড়ি বেঙ্গাইজোত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই শহিদদের স্মরণ করে তৈরি করা হয়েছে শহিদবেদি। সারাবছর অবহেলায় গায়ে ধুলো মাখলেও ২৫ মে নকশালবাড়ি দিবসের আগে সাফসুতরো হয়। নকশালবাড়ি দিবস উপলক্ষ্যে বড় মিছিল হয়। এ বছর অবশ্য করোনার জেরে সেভাবে কোনও অনুষ্ঠান করা হবে না।
বদলে যাচ্ছে নকশালবাড়ি। তবে বদলায়নি প্রসাদুজোতের সেই জোড়া বটগাছ। নকশালবাড়ি আন্দোলনের জেরে ১১ জনের মৃত্যুর স্মৃতি বুকে নিয়ে রাস্তার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে সবকিছুর নীরব সাক্ষী বোধহয় একমাত্র তারাই।