নাজিমের তৈরি পোশাক পরেন জগন্নাথ-বলরাম

192

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : সবার ওপর মানুষ সত্য, তাহার ওপর নাই। এই প্রবাদ বাক্যের উদাহরণ হরিশ্চন্দ্রপুরের বাসিন্দা নাজিম শেখ। জাতপাত, জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে জগন্নাথদেবের পোশাক তৈরি করছেন নাজিম সাহেব। তাঁর বানানো পোশাকে সেজে পথ পরিক্রমায় বের হন জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির গড়ে উঠেছে এই রথযাত্রা ঘিরে।

করোনা সংকটের জেরে দেশজুড়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আসন্ন রথযাত্রাতেও এর প্রভাব পড়েছে। পুরীর রথযাত্রার মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিমকোর্টে। সংক্রমণ আটকাতে বহু জায়গায় বন্ধ করা হয়েছে রথযাত্রা। ব্যতিক্রম নয় হরিশচন্দ্রপুরও। দুই দশক ধরে হরিশ্চন্দ্রপুর হয়ে আসছে রথযাত্রা। এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দুই দশক ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য বার্তা দিয়ে আসছেন হরিশ্চন্দ্রপুরের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা কার্তিক ভট্টাচার্যের উদ্যোগে এই রথযাত্রা শুরু হয়। রথযাত্রার আগে প্রতিবছরই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার নতুন পোশাক তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিন ভাই বোনের পোশাক বানানোর বরাত পান নাজিম শেখ। নাজিম সাহেবের বানানো পোশাকেই সেজে হরিশ্চন্দ্রপুরের পিতলের রথে ওঠেন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা। নাজিম শেখের হাতে তৈরি নতুন পোশাকে রথ নিয়ে হরিশ্চন্দ্রপুর পরিক্রমায় বের হন এই তিন দেবদেবী।

- Advertisement -

হরিশ্চন্দ্রপুর পিতলের রথের প্রতিষ্ঠাতা কার্তিক ভট্টাচার্য জানালেন, পুরাতন মালদায় দিদির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে রথ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে হরিশ্চন্দ্রপুরে তিনি পিতলের রথ বানিয়েছিলেন। খাগড়াঘাট, নবদ্বীপ প্রভৃতি জায়গা থেকে কারিগররা এসে রথ তৈরি করেন।  সঙ্গে তৈরি হয় নিম কাঠের তিন দেবদেবীর মূর্তি। তৈরি হয় আরও কিছু বিগ্রহ। প্রথম বছর থেকেই এলাকারই দর্জি নাজিম শেখ এই দেবদেবীর পোশাক বানিয়ে আসছেন। কার্তিকবাবু বলেন, এর মধ্যে আমরা কোন ধর্মের ভেদাভেদ দেখিনা । প্রতি বছর রথযাত্রার কয়েকদিন  আগে আমি ঠাকুরের কাপড় নিয়ে আসি। নাজিম শেখ মাপ অনুযায়ী সেই কাপড় থেকে তিন ভাইবোনের পোশাক বানিয়ে দেন। সেই পোশাক পরে জগন্নাথ বলভদ্র ও সুভদ্রা নগর পরিক্রমায় বের হন। সাতদিন ধরে পুজো পান। মাসির বাড়ি থেকে ফেরেন সাতদিন পরে। এ বছরটা ব্যতিক্রম। করোনা আবহে এবছর রথযাত্রা স্থগিত রাখতে হয়েছে। বাড়িতেই স্থায়ী মন্দিরে এবার সাতদিন ধরে তিন দেবতার পুজো দেওয়া হবে। নিয়ম মেনে সবকিছুই করা হবে। শুধু হবে না রথযাত্রা। প্রতি বছরের মতো এবারও নাজিম শেখ তিন বিগ্রহের জন্য পোশাক বানাবেন।

এ প্রসঙ্গে নাজিম সাহেব জানালেন, আমি প্রতিবারই হরিশ্চন্দ্রপুরে রথের দিন দেবদেবীর পুজোর জন্য নতুন পোশাক তৈরি করি। জরি, নতুন পাড় প্রভৃতি দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার পোশাক তৈরি হয়। ভালোভাবে তৈরি করতে না পারলে নিজেরই খারাপ লাগে। তবে এ বছরটা খুব মন খারাপ। পুজোটা হলেও হরিশ্চন্দ্রপুর পরিক্রমায় বের হবেন না দেবতারা।