শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার : উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (এনবিএসটিসি) ৭৫ বছর পূর্তি বা প্ল্যাটিনাম জুবিলিতেও ব্রাত্য থাকল কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী দোতলা বাস। এনবিএসটিসির ঐতিহ্য বহন করে চলা এই বাসটি এখন কোচবিহারের কেশব রোডে নিগমের বাস টার্মিনাসে অবহেলা ও অনাদরে পড়ে রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে বাসটি সম্পর্কে জানতে পারে-সেজন্য সেটিকে সংরক্ষণ করা অথবা নতুন করে বাসটি চালানোর দাবি তুলেছেন কোচবিহারবাসী। সংস্থার চেয়ারম্যান অপূর্ব সরকার বলেন, বোর্ড মিটিংযে দোতলা বাসটি নিযে আলোচনা হয়েছে। বাসটি কী অবস্থায় রয়েছে তা নিযে একটি টেকনিক্যাল রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। সেটি তৈরি হলেই বাসটি ফের চালানো অথবা সংরক্ষণ করা সম্ভব কিনা-তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাসটিকে ঘিরে কোচবিহারের মানুষের ঐতিহ্য জড়িত রয়েছে। তাই সেটিকে যোগ্য সম্মান আমরা দেব। সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর সন্দীপ দত্ত ফোন না তোলায় এবিষযে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।

১৯৮১ সালে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের উদ্যোগে কোচবিহারের রাজপথে বেশ কয়েকটি দোতলা বাস চালানো শুরু হয়। স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকরা দোতলা বাসে চড়ে আনন্দ উপভোগ করতেন। বিযে বরয়াত্রী বা অন্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করার জন্যও এই বাস ভাড়া নেওয়া হত। দ্রুত এর জনপ্রিয়তা বাড়ে। তবে যাত্রীসংখ্যার তুলনায় জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় বাম আমলের শেষের দিকে দোতলা বাস পরিসেবা বন্ধ হযে যায়। এরপর তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় আসলে সংস্থার তত্কালীন চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষের আমলে একটি বাস সংস্কার করে চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও কিছুদিনের মধ্যেই ফের ওই পরিসেবা বন্ধ হযে যায়। একাধিকবার বাসটি চালুর দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে দোতলা বাসটি বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে কোচবিহারে। ইতিমধ্যেই অন্য একটি দোতলা বাস অকেজো হয়ে ভগ্নপ্রায় হওয়ায় কয়েক বছর আগে তা কেজি দরে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। বাকি পড়ে থাকা একটি বাসেরও যাতে সেই পরিস্থিতি না হয়-সেই দাবি উঠেছে।

বছরখানেক আগে চেন্নাইযে একটি নামি গাড়ি নির্মাণ সংস্থা এই দোতলা বাসটিকে মিউজিয়ামে রাখতে চেয়ে এনবিএসটিসির কাছে আবেদন জানায়। এরপরই কোচবিহারের বাসিন্দাদের একটি অংশ দাবি করে, কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী দোতলা বাসটি চেন্নাইয়ের মিউজিয়ামে রাখা হলে দেশ-বিদেশের মানুষ দোতলা বাসটি দেখার সুযোগ পাবে। সেইসঙ্গে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের নাম জাতীয় স্তরে চর্চিত হবে। অপর অংশের দাবি, যেহেতু বাসটির সঙ্গে কোচবিহারবাসীর ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে-তাই বাসটি কোনোভাবেই জেলার বাইরে যেতে দেওয়া উচিত নয়। টানাপোড়েনের জেরে বাসটি জেলার বাইরে পাঠানো না হলেও সেটিকে অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে।

কোচবিহারের প্রবীণ বাসিন্দা তথা ইতিহাসবিদ নৃপেন পাল বলেন, বাসটিকে স্মারক হিসেবে রাখা যেতে পারে। ইতিহাস যাতে নষ্ট না হযে য়ায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। বিশ্ববিদ্যালযে ছাত্র সৌরভ পাল বলেন, দোতলা বাস সব জায়গায় দেখা য়ায় না। কিন্তু একসময় কোচবিহারের রাজপথে এই বাসের দেখা মিলত। নতুন প্রজন্ম যাতে বাসটি দেখতে ও তার সম্পর্কে জানতে পারে-সেজন্য নতুন করে বাসটি চালানোর উদ্যোগ নিক কর্তৃপক্ষ। নর্থবেঙ্গল স্টেট ট্রান্সপোর্ট এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সম্পাদক জগত্জ্যোতি দত্ত বলেন, বাসটি চালানোর খরচ অনেক। নিয়মিত চালানো হলে লাভজনক হবে না তা ঠিকই। কিন্তু এধরনের বাস ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে কিনা তা অনিশ্চিত। সেজন্য ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে বাসটি মেরামত করে মাঝেমধ্যে চালানো উচিত।