জুতো ছিঁড়েছে, খালি পায়ে নিকিতারা

115

কৌশিক দাস, ক্রান্তি : ক্লাস ওয়ানের নিকিতা ওরাওঁ বা ক্লাস ফোরের বিশাল ওরাওঁদের আজকাল খুব কষ্ট। চটি, জুতো নেই। ২০১৮ সালে স্কুল থেকে শেষবারের মতো জুতো দেওয়া হয়েছিল। সেই জুতো ফেটেফুটে একাকার। তাই খালি পা নিদেনপক্ষে বহু ব্যবহারে জরাজীর্ণ সেই জুতোই ভরসা। কিন্তু শীতে যে বড্ড কষ্ট। হিমের ছোবলে কচিকাঁচাদের পা ফেটেছে। খালি পায়ে মাঠেঘাটে দৌড়ে বেড়ানোর উপরিপাওনা কাঁটা ফুটে রক্তপাত। এমনটা রোজকারই রুটিন। বাবা-মায়েরা চা বাগানের বাসিন্দা। ঠিকমতো পেটের ভাত জোটানোই যেখানে মুশকিল, সেখানে ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন চটি, জুতোর ব্যবস্থা করা তো দূর অস্ত। আর তাই ক্লাস টুর শিরি ওরাওঁ বা ক্লাস ফোরের কুণাল ওরাওঁদের কষ্টটা রোজকে রোজ বেড়েই চলেছে।

নেপুচাপুর চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহসিন আলি বলেন, পড়ুয়াদের অনেকে আগে খালি পায়ে বা ছেঁড়া চপ্পল পায়ে স্কুলে আসত। গরমের সময় না হলেও শীতের সময় ওদের খুব সমস্যা হত। ওদের সমস্যা মেটাতে রাজ্য সরকার ওই পড়ুয়াদের জন্য সময়মতো জুতোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু ওই জুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় ওরা সমস্যায় পড়েছে। করোনা পরিস্থিতির জেরে পড়ুয়ারা বর্তমানে স্কুলে আসতে পারছে না। পাশাপাশি, বর্তমান পরিস্থিতিতে বহু অভিভাবকের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। তাঁরা ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন চটি, জুতোর ব্যবস্থা করতে পারছেন না। সমস্যা মেটাতে প্রশাসন অবশ্য উদ্যোগী হয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা পরিদর্শক মানবেন্দ্র ঘোষ বলেন, প্রাথমিকের পড়ুয়াদের জুতো দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এজন্য জেলা থেকে প্রয়োজনীয় তালিকা পাঠানো হয়েছে। পড়ুয়ারা হয়ত শীঘ্রই জুতো পাবে।

- Advertisement -

মাল ব্লকের কুমলাই, তেশিমলা, ক্রান্তি, চ্যাংমারি, রাজাডাঙ্গার মতো এলাকাগুলির বেশিরভাগই চা বাগান অধ্যুষিত বা জঙ্গল লাগোয়া এলাকা। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, নানা নাগরিক পরিষেবার অভাব। বাসিন্দাদের বেশিরভোগই আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। এসব এলাকায় শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের তরফে বেশ কিছু প্রাথমিক স্কুল স্থাপন করা হয়েছিল। পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করতে রাজ্য সরকার যে সমস্ত পরিকল্পনা করেছিল তার অন্যতম ছিল বিনামূল্যে জুতো। এর সুবাদে বহু পড়ুয়া উপকৃত হয়। কিন্তু স্কুল থেকে পাওয়া পড়ুয়াদের জুতোগুলির বেশিরভাগই ফেটেফুটে গিয়েছে। বাধ্য হয়ে সেগুলিই ব্যবহার বা খালি পায়ে নিকিতাদের থাকতে হচ্ছে।

ছেলেমেয়েদের অবস্থা দেখে বাবা-মায়েদের চোখে জল। কৈলাসপুর চা বাগানের অস্থায়ী শ্রমিক সরিতা মুন্ডা বলেন, চা বাগানে কাজ করে যে পারিশ্রমিক পাই তা দিয়ে দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাতেই হিমসিম খেতে হয়। বছরতিনেক আগে স্কুল থেকে ছেলেমেয়েদের জুতো দেওয়া হয়েছিল। মাসছয়েক চলার পর সেগুলি ফেটেফুটে যায়। পরে ছেলেমেয়েদের একজোড়া চপ্পল কিনে দিলেও সেগুলিও ছিঁড়ে গিয়েছে। ফের যে ওদের চটি কিনে দেব সেই সামর্থ্য কোথায়? সরকার থেকে প্রতি বছর জুতোর ব্যবস্থা করা হলে আমাদের মতো ঘরের ছেলেমেয়েরা খুবই উপকৃত হবে। রাজাডাঙ্গার অভিভাবক জয়রাম ওরাওঁ বলেন, আমাদের কাছে একজোড়া জুতোর যে অনেকটাই দাম। সন্তানের জুতোর পিছনে টাকা খরচ করলে বাড়িতে যে চাল আসবে না।