শিলিগুড়িতে লকডাউনে লড়াইয়ে নেমেছেন নীলা

511

সানি সরকার, শিলিগুড়ি : পরিচারিকার কাজ কেড়ে নিয়েছে কোভিড-১৯। রাজনৈতিক নেতার সুপারিশ না থাকায় নাম ওঠেনি বিপিএল তালিকায়, মেলেনি উজ্জ্বলা প্রকল্পে গ্যাস। দারিদ্র‌্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। তবু বিশেষভাবে সক্ষম তিন ভাইবোনকে নিয়ে করোনা যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন দেখছেন শান্তিনগরের নীলা সরকার। মাটির উনুনে রান্না করার ফাঁকে বলেন, রোগটা ঠিক চলে যাবে। যত তাড়াতাড়ি যাবে ততই ভালো। আবার ভাইটা ভিক্ষা করতে পারবে, আমিও বাসাবাড়িতে কাজ করতে পারব। খুব কষ্টে দিন কাটছে এখন। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের যাবতীয় প্রকল্প থাকার পরেও কেন এমন অবস্থায় দিন কাটবে একটি পরিবারের? রাজগঞ্জের বিডিও এন সি শেরপা বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। অসহায় পরিবারটি য়াতে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পায়, সেটা দেখছি।

স্বামী ছেড়ে চলে গিয়েছেন প্রায় তিন দশক আগে। আশ্রয় নিয়েছিলেন বাবার বাড়িতে। কিন্তু বাবা-মা মারা গিয়েছেন বেশ কয়েবছর আগে। ফলে জন্মগত দৃষ্টিহীন দুই ভাইবোন এবং পরবর্তীতে হঠাৎই দৃষ্টিহীন হয়ে যাওয়া আরও এক ভাইয়ের দাযিত্ব কাঁধে চাপে তাঁর। কিন্তু শুধু নিজের কর্তব্যে তিন ভাইবোনকে ছেড়ে কোথাও য়েতে পারেননি শিলিগুড়ি পুরনিগমের শান্তিনগরের বাসিন্দা ৪৮ বছরের নীলাদেবী। বরং বিশেষভাবে সক্ষম তিনজনকে আগলে রেখে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারের শত দারিদ্র‌্য ঢাকা পড়ে যায় তাঁর মুখের হাসিতে। কিন্তু এই হাসির আড়ালেই থেকে যায় অনেক ক্ষোভ আর কঠিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে। বললেন, সবাইকেই তো কষ্ট করতে হয়। আমিও করছি। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ আনার জন্য অনেকের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিপিএল কার্ড না থাকায় হয়নি। রাতে অন্ধকারেই থাকতে হয়। বিপিএল তালিকাভুক্ত হতে না পারার জন্য যথারীতি মেলেনি উজ্জ্বলা প্রকল্পে গ্যাসের সিলিন্ডার। তাই তাঁকে পরিচারিকার কাজে বের হওয়ার আগে এলাকা চষতে হয় শুকনো পাতা এবং কাঠ জোগাড় করতে। তবে জ্বালানি সংগ্রহ করার জন্য তাঁর হাতে এখন অফুরন্ত সময়। করোনার প্রভাবে পরিচারিকার কাজে ছেদ পড়েছে। বললেন, রোগটা দেখা দেওয়ার পর থেকেই কাজে যেতে মানা করেছে। তবে টাকা দেবে বলেছে। মাসিক এই একহাজার টাকাই এখন তাঁর সংসার চালানোর পুঁজি। লকডাউনের জেরে পরিবারের আরও এক রোজগেরে ভাই দীপক ভিক্ষা করতে বের হতে পারছেন না। জন্মগত দৃষ্টিহীন এই যুবকের দিন কাটছে বিছানায় শুয়ে। নীলাদেবীর বড় ভাই রঞ্জন একসময় সাইনবোর্ড লিখতেন। সেই রোজগার কাজে লাগত সংসারে। হঠাৎই তিনিও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। সামর্থ্য না থাকায় তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি নীলাদেবী। তাঁর দৃষ্টিহীন বোনও কথা বলা ভুলে গিয়েছেন। এখন ঠিকমতো শুনতেও পান না। একই দশা বাকি দুজনেরও। এমন তিন ভাইবোনকে নিয়ে জোড়াপানি নদীর চরের একচিলতে বাড়িতে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া নীলাদেবী বলেন, কী করব, ফেলে তো দিতে পারি না। যতদিন বেঁচে থাকব, ওদের সঙ্গেই থাকব।

- Advertisement -