সবার অলক্ষে চলে গেলেন নেতাজির সৈনিক

শক্তিপ্রসাদ জোয়ারদার, কিশনগঞ্জ : দেশের জন্য একসময় জীবনপণ করেছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পাশে দাঁড়িয়ে যোগ দিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজে। দীর্ঘদিন ধরে সেই বাহিনীর হয়ে লড়াই করেছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর কেউ মনে রাখেনি এই লড়াকু স্বাধীনতা সংগ্রামীকে। স্বাধীনতা সংগ্রামী পেনশনের জন্য প্রশাসনের বহু দরজায় ঘুরেছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁকে যোগ্য সম্মান দেয়নি। অবশেষে সকলের অজান্তেই দেহত্যাগ করলেন কিশনগঞ্জের পুঠিয়ারা ব্লকের মতিহারা গ্রামের বাসিন্দা তথা আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রাক্তন সৈনিক রামবিলাস মাহাতো। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১১২ বছর। মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সৌজন্যতা দেখানোর অনুভব করেনি কোনও রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে প্রশাসন।

প্রয়াত প্রাক্তন সৈনিকের ৮০ বছরের ছেলে কানাইয়া মাহাতো বলেন, প্রায় এক বছর ধরে বাবা অসুস্থ ছিলেন। ১৯৪৫ সালে নেতাজির ডাকে আরা জেলার উত্তরদাহ গ্রামের প্রায় ৫০ জন নবযুবক রেঙ্গুনে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন। এই ৫০ জনের মধ্যে সেই গ্রামের তরুণ রামবিলাসজিও ছিলেন। তাঁরা সুদূর বিহার থেকে রেঙ্গুনে চাকরি করতে যান। কানাইয়াবাবু বলেন, বাবার মুখে শুনেছি রেঙ্গুনের জিয়াবাড়ি চিনি মিলের ক্যাম্পাসে নতুন রিক্রুটদের ট্রেনিং সেন্টার ছিল। নেতাজিও মাঝেমধ্যে এই ক্যাম্পে আসতেন। এমনকি তাঁরা যুদ্ধেও শামিল হন। কিন্তু প্রচণ্ড বর্ষা ও জাপানের অসহযোগিতার ফলে আজাদ হিন্দ ফৌজ পরাজিত হয়। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের স্বাধীন ভারত সরকার কোনও সুযোগসুবিধা দেয়নি।

- Advertisement -

১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির উদ্যোগে সমুদ্রপথে রামবিলাসবাবু সমেত ১৬টি পরিবারকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপরই ১৬ বার্মিজ রিফিউজি পরিবারকে জেলার পুঠিয়া ব্লকের রায়পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ধূমনিয়া গ্রামে তিন একর জমির বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। আজ যা জেলায় বার্মিজ বাস্তুহারা কলোনি নামে পরিচিত। কিশনগঞ্জে আসার পরে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রাক্তন বৃদ্ধ সৈনিক জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের দরজায় দরজায় সাহায্যের জন্য দৌড়াদৌড়ি করেন। কিন্তু অভিযোগ, কোনও সরকারি সাহায্য পাননি। আর দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আজাদ হিন্দ সরকারকে পছন্দ করতেন না। তাঁর নীতির জন্যই ওই বাহিনীর কোনও সেনা পেনশন বা সাম্মানিক ভাতা পাননি। আর সবার অজান্তে আজাদ হিন্দ ফৌজের এই প্রাক্তন সৈনিক অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেও কেউ তাঁর খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।

জেলা প্রশাসনের কোনও শীর্ষস্থানীয় কর্তা বা তথাকথিত নেতারা জানেন না প্রয়াত ১১২ বছরের বৃদ্ধ রামবিলাসবাবুকে। কিন্তু মঙ্গলবার রাত থেকে এদিন সকাল পর্যন্ত নিজের ও আশেপাশের দিনদরিদ্র গ্রামবাসীদের ভিড় উপচে পড়ে প্রয়াত সৈনিকের বাড়িতে। বুধবার দুপুরে প্রয়াত সৈনিকের ৮০ বছরের সন্তান কানাইয়াবাবু ডক নদীর তীরে বাবার মুখাগ্নি করেন। আর কিশনগঞ্জে আজাদ হিন্দ ফৌজের শেষস্মৃতি পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল।