নেটে গতি নেই, ওয়ার্ক ফ্রম হিলে পিছিয়ে দার্জিলিং-ডুয়ার্স

138

ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি : দিনকয়েক আগেকার কথা। দেরাদুন থেকে মুসৌরির পথে একটি রিসর্টের বিজ্ঞাপনটা ছিল এরকম- একা বা সপরিবারে চলে আসুন। তিন কামরার রিসর্টে আছে একটা বেডরুম,  বাচ্চাদের একটা ঘর আর একটা অফিস রুম। গোটা রিসর্টে তো বটেই, এমনকি লনে বসেও হাই স্পিড ইন্টারনেট পাবেন। বেড়াতে গিয়ে অফিস রুমের কী দরকার? আসলে কোভিড পরিস্থিতি বেড়ানোর ধারণাই বদলে দিয়েছে। কেমন সেটা? ধরুন, ঘুম থেকে উঠে চায়ের পেয়ালায় হালকা চুমুক দিয়ে সামনে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা উপভোগ করতে করতে ল্যাপটপের বোতামে ক্লিক করে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো যদি দেখে নেওয়া যায়।

বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্তারা এখনও অনেকেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন। তবে, প্রায় দেড় বছর ধরে ঘরবন্দি থাকার অবসাদ কাটাতে তাঁরা এখন হোমের জায়গায় ওয়ার্ক ফ্রম হিল-কে পছন্দের তালিকায় রাখছেন। পাহাড়ের পছন্দসই কোনও জায়গা বেছে সপরিবারে চলে যাচ্ছেন সেখানে। বেড়ানোর আমেজ তো থাকছেই, তার পাশাপাশি অফিসের কাজের সঙ্গে অনলাইনে ছেলেমেয়ের স্কুলের ক্লাসও চলছে পুরোদমে। তবে জায়গা বেছে নেওয়ার সময় তাঁরা ভালোভাবে জেনে নিচ্ছেন কোথায় রয়েছে হাই স্পিড ইন্টারনেট পরিষেবা। কেন-না, ইন্টারনেট পরিষেবা যদি খারাপ হয়, তাহলে গোটা প্রোগ্রামটাই তো মুখ থুবড়ে পড়বে।

- Advertisement -

এই চিন্তাধারাটা কিন্তু নতুন নয়। হিমাচলপ্রদেশ টুরিজম তাদের ওয়েবসাইটে ওয়ার্ক ফ্রম হিল-এর প্যাকেজ পর্যন্ত চালু করে দিয়েছে অনেকদিন আগেই। আর কোভিডের বাজারে সেই ভাবনা বাজিমাত করে দিয়েছে হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যগুলিতে। সারা দেশে পর্যটন যেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছে সেখানে ওই দুই রাজ্যের হোটেল ও রিসর্ট মালিকরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ওয়ার্ক ফ্রম হিল কনসেপ্ট নিয়ে অথচ একই রকম সম্ভাবনা থাকলেও এই জায়গায় পিছিয়ে পড়েছে দার্জিলিং সহ গোটা পাহাড় এবং ডুয়ার্স। প্রতি বছর পর্যটকের ঢল নামার পরেও কালিম্পং থেকে মিরিক, কার্সিয়াং থেকে দার্জিলিং কোথাওই নজর দেওয়া হয়নি ইন্টারনেট পরিষেবার দিকে।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোভিড মারাত্মক আকার নেওয়ার সময় থেকেই অনেক কোম্পানি তাঁদের কর্মীদের ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নির্দেশ দিয়েছে। প্রথমে বাড়িতে বসেই অফিসের কাজ করলেও এখন ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সংজ্ঞা বদলে ফেলেছেন অনেকে। নিজের ঠিকানাই সামযিক বদলে ফেলছেন তাঁরা। একা বা সপরিবারে পাহাড়ের কোলে কোনও জায়গায় চলে যাচ্ছেন দিন পনেরো কিংবা মাসখানেকের জন্য। আস্তানা হচ্ছে কোনও হোটেল, হোমস্টে বা রিসর্ট। তবে এক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজের শংসাপত্র বা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করা আরটি-পিসিআর শংসাপত্র সঙ্গে রাখতে হচ্ছে।

উত্তরাখণ্ডের পর্যটন ব্যবসায়ী পূরণ নাগপাল ছয়টি কটেজ চালান। তাঁর বক্তব্য, যে কাজ বাড়িতে বসে করতেন সেটাই পাহাড়ের শান্ত নির্মল পরিবেশে কিছুদিন কাটিয়ে শেষ করছেন। এতে পর্যটনের এই খরার বাজারেও উত্তরাখণ্ডের কটেজ, হোটেল ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখছেন।

জম্মু ও কাশ্মীরে এই পরিষেবা চালু হলেও সেখানকার ইন্টারনেট সংযোগ খুব উন্নতমানের না হওয়ায় সেখানে ওয়ার্ক ফ্রম হিল তেমন জমেনি। কিন্তু উত্তরাখণ্ড ও হিমাচলপ্রদেশে এই কনসেপ্ট এককথায় সুপারহিট। অনেক স্থানীয় মানুষও বাড়ির একটি অংশ সাজিয়ে তা ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। শুধুমাত্র একটি বড় টেবিল, উন্নতমানের ওয়াই-ফাই, রান্নাঘর ঠিক করে দিলেই মাস গেলে একটা মোটা ভাড়া মিলছে। উত্তরাখণ্ডের হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের একটি সূত্র বলছে, প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন রাজ্য থেকে ৮-১০ হাজার মানুষ শুধুমাত্র ওয়ার্ক ফ্রম হিলের জন্য আসছেন।

এ রাজ্যের পর্যটন ব্যবসায়ীরা কিন্তু কপাল চাপড়াচ্ছেন। তাঁদের আক্ষেপ, সবুজ চা বাগান আর জঙ্গলঘেরা ডুয়ার্স আর দার্জিলিং পাহাড়ের সৌন্দর্য উত্তরাখণ্ড ও হিমাচলকে টক্কর দিকে পারে। শুধুমাত্র ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে থাকায় পর্যটনেরও ক্ষতি হচ্ছে। কারণ ওই দুই রাজ্যের মতো দার্জিলিং, কালিম্পং বা বক্সা পাহাড়ের মতো জায়গায় যদি ওয়ার্ক ফ্রম হিল-এর উদ্দেশ্যে রাজ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে সাধারণ মানুষ আসতেন তাহলে এখানকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো কোভিডের ধাক্কা অনেকটাই সামলে উঠত।

পর্যটন ব্যবসায়ী সম্রাট সান্যালের বক্তব্য, হিমাচল ও উত্তরাখণ্ডে ওয়ার্ক ফ্রম হিল বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। পাহাড়ে বসে কাজ করার ফলে সেইসব এলাকার অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু ওয়ার্ক ফ্রম হিলের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হাইস্পিড ইন্টারনেট। সেক্ষেত্রে দার্জিলিং অনেকটাই পিছিয়ে তবে সম্প্রতি নর্থ সিকিমে এক পর্যটক এসেছিলেন কলকাতা থেকে। তিনি ১০ দিন সেখানে থেকে ওয়ার্ক ফ্রম হিল করেছেন।

দার্জিলিং হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বিজয় খান্না বলেন, দার্জিলিংয়ের হোটেলগুলিতে বসে কাজ করার মতো সবরকম পরিবেশই রয়েছে। কিন্তু এখানকার ইন্টারনেট পরিষেবা উন্নতমানের নয়। মাঝেমধ্যেই পরিষেবা ব্যাহত হয়ে পড়ে। সেই কারণে দীর্ঘদিন ধরে এখানে থেকে ওয়ার্ক ফ্রম হিল করা কিছুটা সমস্যার।

আলিপুরদুয়ারের এক পর্যটন ব্যবসায়ী তাঁর নিদারুণ অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন। ভোটের সময় এখানে কাজ করতে কলকাতা থেকে কয়েকজন সাংবাদিক এসেছিলেন। আলিপুরদুয়ার শহরের কিছু দূরে একটি রিসর্টে তাঁরা ছিলেন। ইন্টারনেট পরিষেবার বেহাল দশায় তাঁরা একদিন থেকেই এখানকার আস্তানা গুটিয়ে ফেলেন। ওই ব্যবসায়ী বলেন, এরপর বক্সা পাহাড়ে ওয়ার্ক ফ্রম হিল কনসেপ্ট স্বপ্ন নয়, দুঃস্বপ্ন।