দেড় বছরেও চালু হয়নি কৃষি কলেজের নতুন ভবন

সাজাহান আলি, পতিরাম : কয়েক কোটি টাকা খরচ করে পতিরামের মাঝিয়ান কৃষি কলেজের জন্য তৈরি হয়েছে তিনতলার অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং। রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে এর উদ্বোধন করে গিয়েছেন খোদ কৃষিমন্ত্রী, উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিনিধি সহ বহু বিশিষ্টজন। কিন্তু উদ্বোধনের এক বছর পরেও আসবাবপত্র, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি সহ কিছু জিনিসের অভাবে আজও এই ভবনে কৃষি কলেজের ক্লাস চালু হয়নি। ফলে পুরোনো ভবনের ছোট পরিসরে বহু কষ্টে চলছে কৃষি কলেজের চারটি বর্ষের পঠনপাঠন। ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রীরা জানেন না, কবে তাঁদের পঠনপাঠনের এই সমস্যা দূর হবে। কয়েক কোটির অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে তাঁরা কবে ক্লাস করার সুযোগ পাবেন। এনিয়ে উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা মাঝিয়ান কৃষি কলেজের ছাত্রছাত্রীরা একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ ও হতাশ।

পতিরামের পার্শ্ববর্তী মাঝিয়ান কৃষি কলেজের পথচলা শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। শুরুতে মাঝিয়ান ক্যাম্পাসের ভিতর ছোট দুটি ঘরে ক্লাস শুরু হয়েছিল। পরে চারটি বর্ষের ক্লাস শুরু হয় ছোট ছোট তিনটি অস্থায়ী ঘরে। ছোট ঘরগুলিতে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করা মুশকিল। এর উপর অস্থায়ী ঘরগুলিতে রয়েছে ফলস রুফ, যা দিয়ে একটু বৃষ্টি হলেই জল পড়ে। এই সমস্যা দূর করার জন্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা খরচ করে মাঝিয়ান ক্যাম্পাসে কৃষি কলেজের জন্য চারটি বিরাটাকার ভবন তৈরি হয় প্রায় দেড় বছর আগে। এই চারটি ভবন হল অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং, প্রশাসনিক ভবন, বয়েজ ও গার্লস হস্টেল। নতুন ভবনের উদ্বোধন হয় ২০১৯ সালের ২১ অগাস্ট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিনিধি, উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা শাসক সহ বহু বিশিষ্টজন।

- Advertisement -

সেদিন মাঝিয়ান কৃষি কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কলেজ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, এতদিন পর এবার নতুন ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা নিয়ে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে ক্লাস শুরু হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে। মাঝিয়ান কৃষি কলেজের তিনতলা অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে রয়েছে অনেকগুলি ঘর। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাস রুম ছয়টি, সেমিনার রুম ছয়টি, পরীক্ষা হল দুটি, লাইব্রেরি একটি, অডিটোরিয়াম একটি এবং ল্যাবরেটরি ১১টি। এই ল্যাবরেটরিগুলি বিভিন্ন বিষয়ে। যেমন অ্যাগ্রোনমি, জেনেটিক্স প্ল্যান ব্রিডিং, কম্পিউটার সায়েন্স, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্ম মেশিনারি, ইকোনমিক্স, এক্সটেনশন, হর্টিকালচার, স্ট্যাটিসটিক্স এবং সয়েল সায়েন্সর দুটি। কিন্তু কয়েক কোটি টাকায় বিরাটাকার অ্যাকাডেমিক ভবন তৈরি হলেও ক্লাস চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি, লাইব্রেরির বইপত্র ইত্যাদি কোনও কিছুই না থাকায় পুরোনো ভবন থেকে নতুন ভবনে ক্লাসগুলিকে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।

মাঝিয়ান কৃষি কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আসফাক মোল্লা জানান, অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং উদ্বোধন হয়েছে গত অগাস্টে। তারপর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ক্লাস স্থানান্তর হল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে তরফে মাঝিয়ান ক্যাম্পাসে এসে শীর্ষ আধিকারিকরা একাধিকবার আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে ছোট ঘরে জলে ভিজে বহু কষ্টে আমাদের পড়াশোনা করতে হয়। এবিষয়ে আমরা মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ও হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করছি। চতুর্থ বর্ষের আরেক ছাত্র সুখেন্দু নন্দী বলেন, অনেকদিন ধরে শুনে আসছি, শীঘ্রই নতুন অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে ক্লাস শুরু হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, অশিক্ষক কর্মীরও অভাব। নতুন ভবন এক বছর আগে উদ্বোধন হয়েছে। কিন্তু আসবাবপত্র, পানীয় জল, বইপত্র, ল্যাবরেটরির কোনও যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় নতুন ভবনে ক্লাসই শুরু হল না।

তাঁদের অভিযোগ, অশিক্ষক কর্মী ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নতুন ভবনের চারিদিকে আগাছা, নোংরা, ময়লা জমে গিয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরির কোনও সুবিধা না পাওয়ায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজ্য সরকারের অবিলম্বে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে কার্যকরী পদক্ষেপ করা উচিত। একই বক্তব্য তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অগ্নিভ দত্ত, শ্রীপর্ণা সিংহ, মানব বর্মন, সুচিত্রা কারজি, চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ডিয়ান মণ্ডল, সৌমেন চক্রবর্তীদের। কৃষি কলেজের বয়েজ হস্টেলের প্রহোস্ট তথা কৃষি বিজ্ঞানী বাপ্পা প্রামাণিক বলেন, মাঝিয়ান কৃষি কলেজের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্রের চাহিদা মিটলেই নতুন ভবনে ক্লাস শুরু হবে। বিশেষ করে অশিক্ষক কর্মচারী কলেজে না থাকার জন্য নতুন ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ একেবারেই হচ্ছে না। আগাছা ও নোংরায় নতুন ভবন বিশ্রী হয়ে রয়েছে। কর্তৃপক্ষের খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টিতে নজর দেওয়া উচিত।

ছাত্রছাত্রীদের তোলা অভিযোগ ও নতুন অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং উদ্বোধনের একবছর পরও ক্লাস শুরু না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মাঝিয়ান কৃষি কলেজের অ্যাসোসিয়েট ডিন ও মাঝিয়ান আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রের ইনচার্জ জ্যোতির্ময় কারফর্মা বলেন, বিষয়টি দুঃখের হলেও সত্যি। উদ্বোধনের এক বছর পরেও অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে ক্লাস শুরু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বাস্তব পরিস্থিতি মেনে জানান, নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস শুরু করার জন্য জরুরি প্রয়োজন চেয়ার, ডেস্ক, ডিজিটাল বোর্ড, প্রোজেক্টর, ল্যাবরেটরির জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, জলের লাইন, কম্পিউটার, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী ইত্যাদি। এই কলেজে প্রথম বর্ষে আসন সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করার প্রস্তাবও রয়েছে। কিন্তু অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং ও প্রশাসনিক ভবনের আসবাবপত্র সহ অন্যান্য পরিকাঠামোর অভাব পূরণ না হলে আসন বৃদ্ধির বিষয়টি কার্যকর করা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজ্য সরকারের কাছে এনিয়ে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রয়োজন মেটেনি। বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। গোটা ঘটনায় স্বভাবতই পতিরাম এলাকা তথা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার শিক্ষানুরাগী মানুষজন প্রশ্ন তুলেছেন, যদি ছাত্রছাত্রীদের কাজেই না আসে, তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মাঝিয়ান কৃষি কলেজের বিরাট ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং তৈরি করে কী লাভ?