কোভিডযুদ্ধে অস্ত্র নয়া যৌগ, ইতিহাস গড়ার পথে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়

37
প্রতীকী

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন দিশা দেখাবে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিষ্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর যৌগ তৈরি করে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ল্যাবে যৌগটি তৈরি হয়েছে। যৌগের কার্যকারিতা প্রমাণ করে ফরিদাবাদের কেন্দ্রীয় সরকারের রিজিওনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনলজি ইতিমধ্যেই সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা নেচার গ্রুপও এই গবেষণাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের সায়েন্টিফিক রিভিউ বিভাগে গবেষণাপত্রটি প্রকাশের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই গবেষণাপত্রটি নেচারে প্রকাশিত হবে বলে গবেষক দলের প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ভাস্কর বিশ্বাস জানিয়েছেন।

ভাস্করবাবুর কথায়, আমরা যাবতীয় চেষ্টা চালাচ্ছি। বিজ্ঞানী মহলে গবেষণার সাফল্য সাড়া ফেলেছে। পরবর্তী গবেষণার জন্য অনেকেই সহযোগিতা করতে আগ্রহী। দেশের প্রান্তিক জনপদে বসে কোভিড নিয়ে গবেষণায় সাফল্য নতুন কাজে উৎসাহ জোগাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ডিন সুভাষচন্দ্র রায় বলেন, আমরা খুব খুশি। সব থেকে উল্লেখযোগ্য হল, আমাদের গবেষকদের তৈরি যৌগ বাজারে ওষুধ হিসাবে এলে সাধারণ মানুষ জলের দরে তা কিনতে পারবেন। তার জন্যও চেষ্টা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সবরকম সহযোগিতা করা হবে।

- Advertisement -

কোভিডের প্রকোপ শুরুর পর থেকেই গবেষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ল্যাবে যৌগ তৈরির কাজে লেগে পড়েছিলেন। তাঁরা এমন একটি যৌগের খোঁজে ছিলেন যা পরবর্তী সময়ে ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। সেই অনুসারেই ২, ৩-ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড নামের যৌগটি তৈরি করা হয়। তারপর অত্যাধুনিক কম্পিউটার এইডেড ড্রাগ ডিজাইন পদ্ধতির মাধ্যমে যৌগের ওষধি গুণাগুণ যাচাই করা হয়। বেশ কয়েকটি প্যারামিটার যাচাইয়ে পর যৌগটি সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর ভমিকা নেবে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন।

শুধু কোভিডই নয়, পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড যৌগটি ক্ষতিকর ব্যকটিরিয়ার বিরুদ্ধেও অত্যন্ত কার্যকর। টেট্রাসাইক্লিন নামক একটি অ্যান্টিবাযোটিকের কার্যকারিতার সঙ্গে ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইডের তুলনামূলক বিচার করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়ার বিরুদ্ধে দুটিই প্রায় সমান কার্যকর। ফলে নতুন যৌগ থেকে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকও

কোভিডযুদ্ধে অস্ত্র নয়া যৌগ, ইতিহাস গড়ার পথে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaতৈরি করা যেতে পারে।

যৌগের কার্যকারিতা সুনিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট যোগ্যতামানের প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষাগারে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে যৌগটির পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। গোটা দেশে একমাত্র রিজিওনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনলজিতেই সেই পরীক্ষা সম্ভব। সেইমতো চলতি বছর জানুয়ারিতে যৌগটি সেখানে পাঠানো হয়। মার্চের শেষে ফলাফল আসতেই খুশির খবর। সরকারি নির্দেশ অনুসারে রেমডেসিভিরকে প্রমাণ মান ধরে ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড-এর গুণাগুণ যাচাই করা হয়। দেখা যায়, কোভিড ভাইরাসের বিরুদ্ধে রেমডেসিভির যেখানে ২৪ ঘণ্টায় ৯৯ শতাংশ কার্যকর, সেখানে ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড-এর কার্যকারিতা ৭১ শতাংশ।

ভাস্করবাবু জানিয়েছেন, ফরিদাবাদের গবেষণাগারে পরীক্ষার সময় স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর ভেরো-ই-৬ সেল লাইনের উপর যৌগটি প্রযোগ করা হয়েছিল। অর্থাৎ পরীক্ষাগারে প্রথমে নির্দিষ্ট কোষগুলিকে কোভিড সংক্রামিত করা হয়। তারপর আক্রান্ত কিছু কোষে রেমডেসিভির ও অন্যান্য কিছু কোষে ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড প্রযোগ করে কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। দেখা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষকদের তৈরি যৌগটি কোভিডের বিরুদ্ধে ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে লড়াই করছে। লড়াই করেছে অন্য কোনও সজীব কোষের তেমন কোনও ক্ষতি না করেই। অর্থাৎ যৌগটির প্রয়োগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম হবে।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের গবেষক রজনীকান্ত মাহাতো, বায়োটেকনলজি বিভাগের গবেষক অয়ন মহান্তি ছাড়াও তামিলনাডুর আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক মুড্ডু কৃষ্ণাইয়া কোটাকোন্ডা ও শ্রীরামকৃষ্ণ ইনস্টিটিউট অফ প্যারামেডিকেল সায়েন্সের অধ্যাপক সুন্নাকু প্রসাদ ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড তৈরির গবেষক দলে রয়েছেন। শুরু থেকেই গবেষণার তদারকি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য গবেষক দল উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অয়নবাবু বলেন, কোন পথে চললে গবেষণায় সাফল্য আসতে পারে, সেজন্য উপাচার্য বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন।

যৌগটির কার্যকারিতা কীভাবে আরও বৃদ্ধি করা যায়, গবেষক দল তা নিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করেছে। যদিও মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রযোগের জন্য আরও বেশ কয়েকটি ধাপে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে হবে। তার জন্য কিছুটা সময় দরকার। কিন্তু সেকাজের জন্য যে পরিকাঠামোর প্রয়োজন, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পরিকাঠামো নেই। গবেষকরা জানিয়েছেন, আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কিছু কাজ করা হচ্ছে। যদিও বড় কোনও জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থা দায়িত্ব না নিলে পরবর্তী পর্যায়ে গবেষণা যে বাস্তবে অনেকটাই কঠিন হবে সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মোটামুটি একমত। তবে পরবর্তী পর্যায়ে যাবতীয় পরীক্ষা শেষ করে ডাইঅ্যামিনোফেনাজিনিয়াম ক্লোরাইড ওষুধ হিসাবে স্বীকৃতি পেলে নতুন ইতিহাস যে  রচিত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।