দেবাঞ্জনের ধাঁচে উত্তরবঙ্গেও প্রতারণার নয়া ছক

544

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : কখনও হিউম্যান রাইটস, কখনও অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো, কখনও বা ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো-নানা নামে উত্তরবঙ্গে প্রতারণার জাল বিছিয়েছে একটি চক্র। নিম্ন অসমজুড়েও নানা কায়দায় প্রতারণার কারবার চালাচ্ছে চক্রটি। উত্তরবঙ্গের জেলায় জেলায় সক্রিয় হয়েছে চক্রের একাধিক পান্ডা। তাদের কেউ নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ক্রাইম অফিসার হিসাবে, কেউ হিউম্যান রাইটস সংগঠনের রাজ্য ডিরেক্টর, কেউ বা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন কমিশনার হিসাবে। গাড়ি, ভিজিটিং কার্ডে দেদারে ব্যবহার করছে অশোকস্তম্ভ, জাতীয় পতাকা। ইতিমধ্যেই পুলিশের নজরেও এসেছে বিষয়টি। রাজ্য পুলিশের আইজি (উত্তরবঙ্গ) দেবেন্দ্রপ্রসাদ সিং বলেন, আমরা পুরো ব্যাপারটা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করব।

কসবার ভুয়ো ভ্যাকসিন কাণ্ডে তোলপাড় হয়েছে গোটা রাজ্য। ভুয়ো আইএএস সেজে দেবাঞ্জন দেব যেভাবে এতদিন ধরে মানুষকে বোকা বানিয়েছে তা গুরুতর অপরাধের সমান। শুধু ভুয়ো ভ্যাকসিন দেওয়াই নয়, নানাভাবে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়েছে সে। দেবাঞ্জন তো একটা উদাহরণ মাত্র। এমন প্রতারক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্যেই, উত্তরবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়।

- Advertisement -

দেবাঞ্জন দেবের ঘটনার পর অন্তর্তদন্তে নেমেছিল উত্তরবঙ্গ সংবাদ। সেখানেই  উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। আদতে প্রতারণাচক্রের পান্ডারা হিউম্যান রাইটস, অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো, ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো শব্দগুলির সঙ্গে ন্যাশনাল বা স্টেট এবং অন্য কয়েকটি শব্দ জুড়ে নানা নাম দিয়ে এনজিও তৈরি করছে। তারপর মনগড়া নানা পদ তৈরি করছে। এনজিওর পরিচয়পত্র, ওয়েসাইট, লোগো, ব্যানার, শংসাপত্র সবকিছুই তৈরি হয়েছে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলির অনুকরণে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে অশোকস্তম্ভ সহ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তর বা মন্ত্রকের নাম ও লোগো। কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নাম ও লোগো ব্যবহারও করা হয়েছে।

দেবাঞ্জনের ধাঁচে উত্তরবঙ্গেও প্রতারণার নয়া ছক| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaচক্রের সদস্যরা যেসব গাড়ি নিয়ে ঘুরছে সেগুলিতে সরকারি আমলাদের গাড়ির আদলে নেমপ্লেট, জাতীয় পতাকাও লাগানো থাকছে। একটি এনজিওর ওয়েবসাইট ডিজাইন করা হয়েছে হুবহু একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ওয়েবসাইটের আদলে। সেখানে ঢুকলেই চক্ষু চড়কগাছ হবে যাবে। সাইটে সিআইডি, সিবিআই, এনআইএ, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া আছে। সেগুলি এমনভাবে সাজানো হয়েছে দেখে মনে হবে কোনও সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট। এভাবেই সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গে প্রতারণা কারবারের একটি বড় মাথার বাড়ি কোচবিহারের তুফানগঞ্জে। নিজেকে কখনও ক্রাইম অফিসার, কখনও ন্যাশনাল অ্যান্টি করাপশন ব্যুরোর ডিরেক্টর পরিচয় দিয়ে চার চাকার গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই ব্যক্তি। তার গাড়িতে লাগানো থাকছে জাতীয় পতাকা, নেমপ্লেট, পুলিশের অনুকরণে লোগো। শেষ কয়েক বছরে ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ফুলেফেঁপে উঠেছে। সূত্রের খবর, ওই ব্যক্তি ও তার কয়েকজন শাগরেদ মিলে কয়েক বছর আগে চিটফান্ডের আদলে আয়ুর্বেদিক ওষুধের চেইন মার্কেটিং শুরু করেছিল। বিদেশ ভ্রমণ সহ নানা লোভ দেখিয়ে বাজার থেকে টাকা তোলারও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। শিলিগুড়ি, মালদাতেও চক্রের কয়েকজন পান্ডার খোঁজ মিলেছে।

কীভাবে প্রতারণা চলছে? সদস্যকরণের নামে সরাসরি অর্থ সংগ্রহ করছে চক্রটি। জেলায় সদস্য হতে নেওয়া হচ্ছে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। রাজ্য কমিটির সদস্য হতে গেলে দিতে হচ্ছে ৭-১০ হাজার টাকা। কেউ চাইলেই পদাধিকারীও হতে পারেন। সেক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ খানিকটা বাড়িয়ে দিলেই হয়ে যাবে।

টাকা দিয়ে সদস্য হচ্ছেন কারা, কেনই বা হচ্ছেন? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, মূলত জমি, বালি সহ নানা বেআইনি কারবারের সঙ্গে যুক্ত বহু ব্যক্তি সদস্যপদ নিচ্ছেন। বেশকিছু ব্যবসায়ীরও সদস্যপদ আছে। সদস্য হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁদের হাতে দেওয়া হচ্ছে অশোকস্তম্ভের ছবি দেওয়া পরিচয়পত্র। অনেকেই সেই পরিচয়পত্রকে নিজেদের বেআইনি কারবারের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন।

করোনা যোদ্ধা হিসাবে হঠাৎ করেই বেছে বেছে কিছু ব্যবসায়ী, চিকিৎসকদের সংবর্ধনা দিতে শুরু করেছে ওই প্রতারকদলটি। তাদের পক্ষ থেকে যে শংসাপত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে তাতে অশোকস্তম্ভ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ পুলিশের অনুকরণে তৈরি লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। সংবর্ধনা দেওয়ার পরই নানা কায়দায় সেই ব্যবসায়ী, চিকিৎসকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। চা বলয় সহ গ্রামীণ এলাকায় ঢুকে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে জমি-বাড়ির বিবাদ সহ নানা সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার নামেও টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে চক্রের বিরুদ্ধে।

সব দেখেশুনে স্তম্ভিত দুঁদে আইনজীবীরাও। বিশিষ্ট আইনজীবী পার্থ চৌধুরী বলেন, জনগণের বিশ্বাস অর্জনের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনার আদলে যা যা করা হয়েছে সবটাই প্রতারণা এবং আইনত অপরাধ। অশোকস্তম্ভ, জাতীয় পতাকার ব্যবহার, পুলিশের লোগোর অনুকরণ করা মারাত্মক অপরাধ। ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা করতে পারে পুলিশ। কেউ অভিযোগ না করলেও পুলিশের উচিত স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করা। আইনজীবী আহসান হাবিব বলেন, ওই ধরনের প্রতারণার একাধিক ঘটনা আমাদের কাছে এসেছে। আমরা হাইকোর্টে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রতারকদল বিভিন্ন জায়গায় কেন্দ্রীয় সরকারের জাল শংসপত্র দেখিয়ে প্রভাব খাটাচ্ছে। যেসব মন্ত্রকের শংসাপত্র দেখাচ্ছে সেই মন্ত্রকগুলিতেও চিঠি পাঠানো হচ্ছে।