রোদ-জল সহ্য করে ধানের দেদার ফলন সুধার

123

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : আবহাওয়ার পরিবর্তন হলেও এই পদ্ধতিতে চাষ করা ধানের তাতে কোনও যায়ই আসে না। বেঁচেবর্তে ভালোভাবেই বেড়ে উঠতে পারে। চিরাচরিত চাষের তুলনায় নয়া এই পদ্ধতিতে চাষ করা ধানের ফলনও বেশি। সুনিশ্চিত আমন ধানের চাষ (সিস্টেম অফ অ্যাসিওর্ড রাইস প্রোডাকশন) বা সুধা নামে এই চাষের পদ্ধতি জলপাইগুড়ি জেলার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যে বেশ সাড়াও ফেলেছে। উত্তরের পাহাড়ি এলাকাগুলি বাদে এই জেলাগুলির মধ্যে কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো জেলা রয়েছে। কৃষি দপ্তর জানিয়েছে, এই চাষে মূলত সুস্থসবল ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চারা তৈরিতে জোর দেওয়া হয়। বীজতলাকে পাখির চোখ করে কৃষকরা বাজিমাত করছেন। পাশাপাশি, একবার এই চাষের সাফল্য মিলতে শুরু করায় তাঁরা পুরোনো পদ্ধতির চাষে ফিরতে কোনওমতেই রাজি নন।

আমন ধান চাষের নয়া এই পদ্ধতি রাজ্যের কৃষি অধিকর্তা ডাঃ সম্পদরঞ্জন পাত্রের মস্তিষ্কপ্রসূত। নিজের সৃষ্টিকে সফল হতে দেখে তিনি গর্বিত। বলছেন, এই চাষে কোনও কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। এই ধান করোনাকালে শরীরে রোগ প্রতিরোধক শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ে যাওয়া রোগের হাত থেকে মহিলারা রেহাইও পাবেন। ইতিমধ্যেই ধান চাষের এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত বইয়ে ঠাঁই পেয়েছে। জলপাইগুড়ি সদর মহকুমার কৃষি অধিকর্তা (বিষয়বস্তু) মেহফুজ আহমেদ বলেন, এই পদ্ধতির আমন চাষে ফলনই যে শুধু বাড়ে তা নয়, উৎপাদিত চালে জিঙ্ক, বোরন, ক্যালসিয়াম, ফসফেট ও ভিটামিন বেশি থাকায় তা অন্য চালের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।

- Advertisement -

কৃষি দপ্তর জানিয়েছে, ধান চাষের সাফল্য বীজতলার চারার ওপর নির্ভর করে। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি, দুই-ই চারার পক্ষে ক্ষতিকর। সুধা-য় চাষের সময় লবণজলে বীজ ফেলে যেগুলি ডুবে যাচ্ছে, সেগুলিকে ধুয়ে নিতে কৃষকদের বলা হচ্ছে। এরপর ওই বীজ ২ শতাংশ জিঙ্ক সালফেট দ্রবণে ৩০ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে।  নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে বীজতলা থেকে সংগ্রহ করার পর কৃষকরা দুটি করে চারা মূল জমিতে রোপণ করছেন। দুটি চারার একেকটি গুচ্ছের সঙ্গে অন্য গুচ্ছের ব্যবধান ১০ ইঞ্চি রাখা হচ্ছে। সুধার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, শুকনো বা কাদানে, দুরকমের বীজতলাতেই ধানের চারা তৈরি সম্ভব।

শুকনো বীজতলার চারা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে। পাশাপাশি, ফলনও বেশি দেয়। বয়স্ক চারা রোপণ করা হলেও সুধা পদ্ধতির চাষে উত্পাদনে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর, কৃষি দপ্তর এবারে খরিফ মরশুমে জলপাইগুড়ি জেলার সদর, মালবাজার, ময়নাগুড়ি, ক্রান্তি, নাগরাকাটা ও রাজগঞ্জ ব্লক মিলিয়ে এবার ৭৫০ বিঘা জমিকে সুধা পদ্ধতিতে চাষের আওতায় নিয়ে এসেছে। এর বাইরে কিছু কৃষক নিজেদের উদ্যোগেই এই চাষ শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে জেলায় এক হাজার বিঘা জমিতে বিশেষ পদ্ধতির এই আমন ধানের চাষ হচ্ছে। মূলত ফার্মার্স ক্লাবগুলিকে একাজে শামিল করা হয়েছে। গতবছর মাত্র ৩০০ বিঘা জমিতে শুরুটা হয়েছিল। তাতে বিপুল সাফল্য মেলে। যে কারণে এবছর রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনার মাধ্যমে চাষের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ চাষে যেখানে বিঘা প্রতি ১২-১৪ মন ধান মেলে সেখানে সুধা-র ম্যাজিকে ফলনের পরিমাণ ১৭-১৮ মনে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে। পদ্ধতিটি অত্যন্ত সরল ও কৃষকবান্ধব বলে কৃষিকর্তারা জানাচ্ছেন। চাষের জন্য যে সমস্ত যন্ত্রপাতি বা উপকরণের দরকার, সেসবও কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

ময়নাগুড়ির হুসলুরডাঙ্গার কৃষক রতন বাড়ুই বলছেন, এই চাষ বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। গতবছর বিঘা প্রতি প্রায় ২২ মন করে ধান পেয়েছিলাম। শক্তপোক্ত চারা তৈরি এই চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা। ক্রান্তির দক্ষিণ চ্যাংমারির সবুজ সোনা ফার্মার্স ক্লাবের পক্ষে শুভঙ্কর দাস নামে এক কৃষক বলেন, গতবছর ৭৫ বিঘা জমিতে চাষ করেছিলাম। অভূতপূর্ব ফল পাই। সুধা পদ্ধতিতে যেহেতু সুস্থসবল চারা মেলে, সেকারণে সামান্য রাসায়নিক প্রয়োগ করলেই কাজ হয়ে যায়।