চিপস তৈরির আলু চাষে আশা উত্তরে

125

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : চিপস তৈরির জন্য বিশেষ প্রজাতির আলুর পরীক্ষামূলক চাষে সফল হল উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তরবঙ্গে আলু চাষে কৃষকদের নতুন দিশা দেখাবে এই গবেষণা। ফড়ে বা বড় সংস্থার মুখাপেক্ষী না হয়ে খুব সহজে ওই প্রজাতির আলু থেকে চিপস তৈরি করে বাজারজাত করতে পারবেন কৃষকরাই। নতুন প্রজাতির আলুর চাষ বাড়াবে কর্মসংস্থানও।

ফি বছরই ধসা রোগ বা অন্য ভাইরাসের আক্রমণে উত্তরবঙ্গের জেলায় জেলায় বিঘার পর বিঘা আলু নষ্ট হয়ে যায়। দাম না পেয়ে উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম টাকায় আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন কৃষকরা। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বাস্তবায়িত হলে সেই চেনা ছবিটা বদলে যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন প্রজাতির আলু চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণও দেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সরবরাহ করা হবে আলুবীজ। বেশি পরিমাণে ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধী ওই বীজ তৈরির কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। বছরখানেকের মধ্যেই সেই কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শস্য বিজ্ঞান বিভাগের গবেষক শান্তনু দাস আলুর ওই বিশেষ প্রজাতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর সাফল্য পেয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল ফুড-এ। শস্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অশোক সাহার সঙ্গে বিপ্লব মিত্র, সোমনাথ মণ্ডল এবং প্রদ্যুৎ পাল গবেষণায় সহযোগী হিসাবে কাজ করেছেন।

যেসব প্রজাতির আলু থেকে উন্নতমানের চিপস তৈরি হয় কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় সেগুলিকে বলা হয় প্রসেসিং টাইপ ভ্যারাইটি। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (আইসিএআর) সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতে এখনও পর্যন্ত আলুর ২১টি প্রসেসিং টাইপ ভ্যারাইটি প্রকাশ করেছে সেন্ট্রাল পটেটো রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপিআরআই)। তারমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ৭টি এমন প্রজাতিকে বেছে নেন যেগুলির চাষ উত্তরবঙ্গের মাটিতে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপর বিশ্ববিদ্যালায়ে খামারে সেই সাত প্রজাতির আলুর পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়।

এরপর উত্তরবঙ্গের মাটি, আবহাওয়া, রোগপোকার আক্রমণ সহ বিভিন্ন বিষয়কে মাথায় রেখে চাষের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। সাত প্রজাতির মধ্যে কুফরি চিপসোনা-৩ প্রজাতিটিকে উত্তরবঙ্গে চাষের জন্য চিহ্নিত করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে খামারে সেই প্রজাতির আলু আলাদা করেও চাষ করা হয়। শান্তনুবাবু জানিয়েছেন, চিপস তৈরির জন্য আলুতে যেসব প্যারামিটার থাকা জরুরি সেগুলি খুব ভালো পরিমাণে রয়েছে চিপসোনা-৩এ। ওই প্রজাতির ফলনও হবে প্রচলিত প্রজাতির আলুর থেকে অনেকটা বেশি। হেক্টরে ৩০-৩২ টন।

ফলনের পর ওই আলু থেকে চিপসও তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেই চিপসের সঙ্গে বাজারে চালু বিভিন্ন সংস্থার চিপসের গুণগতমান সহ অন্যান্য পার্থক্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। স্বাদ যাচাইয়ের কাজও হয়েছে। কুফরি চিপসোনা-৩এর চিপস স্বাদে বাজারের যে কোনও চিপসকে টেক্কা দিতে পারে বলেই জানিয়েছেন তাঁরা। ওই প্রজাতির আলু বাড়িতে কেটে কড়াইতে ভেজেই চিপস তৈরি করা যাবে। তাছাড়া গুণগতমান বাড়াতে খুবই কম বিনিযোগে যন্ত্র কিনেও চিপস তৈরি সম্ভব।

অশোকবাবু বলেন, চাহিদামতো দাম না পেলে কৃষকরা বাড়িতেই চিপস তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। হাতের কাছে কাঁচামাল থাকায় স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করে বা সমবায়ের মাধ্যমেও কুটিরশিল্প হিসাবে চিপস তৈরির কারখানা প্রসারলাভ করতে পারবে। ফলে কুফরি চিপসোনা-৩ শুধু কৃষিক্ষেত্রই নয়, উত্তরবঙ্গজুড়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। শান্তনুবাবু বলেন, বাণিজ্যিকভাবে কুফরি চিপসোনা-৩কে বাজারজাত করার ব্যাপারেও আমরা পদক্ষেপ করছি।

কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গে সাদা ত্বকের জ্যোতি, কেকাপ এবং দেশীয় প্রজাতি এবং লাল ত্বকের হল্যান্ড বা ভুটান আলুর চাষ হয়। খুবই সামান্য কিছু জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে অন্যান্য প্রজাতির আলু চাষ হয়। হিসেব বলছে, উত্তরের আট জেলায় ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর আলু চাষ হয়। যেখানে ৩৬ লক্ষ ৩০ হাজার ৭৯১ টন আলু উৎপাদিত হয়, যা রাজ্যের মোট উত্পাদনের ২৮.৯৬ শতাংশ। অর্থাত্ হেক্টর প্রতি ২৭.৪২ টন।

চিপসোনা-৩এর বাণিজ্যিকীকরণে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন সিআইআই-এর উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রুয়াল। তিনি বলেন, রাজ্যে ও রাজ্যের বাইরে চিপসের ব্যাপক চাহিদা আছে। প্যাকেটজাত চিপস এখন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় শিল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা উত্তরের শিল্পের প্রসারে খুবই সহায়ক হবে। কাঁচামালের জোগান থাকলে উদ্যোগপতিরা সহজেই বিনিয়োগ করবেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে সার্বিক সহযোগিতা করব।