সংবাদ শিরোনাম আর সংবাদচিত্রে ইতিহাস ধরা পড়ে

371

ধূপগুড়ি : সোশ্যাল মিডিয় আর স্মার্ট ফোনে মুহূর্তকরে ধরে রাখার দৌড়ে সবাই শামিল।  আট থেকে আশি সকলেই রয়েছেন সেই ট্রেন্ডি হুজুগে। তবে বছর দশেক আগেও চারপাশটা মোটেই এমন ছিল না। মোবাইল ফোন বাজারে চলে এলেও ছবি বা ভিডিও তোলা আর মুহূর্তে তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রযুক্তি সেভাবে ছিল না। দেশ-দুনিয়াকে হাতের নাগালে পেতে হাতিয়ার ছিল সেই টিভির খবর আর প্রতিদিনের সকালে হাতে আসা খবরের কাগজগুলো। সেই সংবাদপত্রের খবর আর ছবি জমানোই ধূপগুড়ির ডঃ কৃষ্ণচন্দ্র দেবের শখ। ধূপগুড়ির বাসিন্দা তথা শালবাড়ি হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডঃ কৃষ্ণচন্দ্র দেবএকেবারে নিজস্ব ভঙ্গিতে ইতিহাস গেঁথে চলেছেন। কৃষ্ণচন্দ্রবাবুর শখের শুরুটা ১৯৬৯ সালে, মাত্র দশ বছর বয়সে। অনেকটা খেয়ালের বশেই বাড়ির খবরের কাগজ থেকে কয়েকটা ছবি কেটে খাতার ভেতরে জমিয়ে রাখা দিয়ে শুরু। তারপর থেকে এটাই যেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তাঁর। খবরের কাগজ থেকে ছবি আর সংবাদ শিরোনাম কেটে জমানো শুরু হয় পুরোদমে। প্রথমে বাবার বকুনি জুটলেও এক সময় তিনিও বোঝেন ছেলের শখের গুরুত্ব। তাই  পরিবারের লোকেরাও সহায়তা করতে শুরু করেন। এভাবেই জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়া, পশ্চিম বাংলার রাজনীতি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, একনায়ক এরশাদ সবই ধীরে ধীরে খবরের কাগজের পাতা থেকে উঠে আসতে থাকে কৃষ্ণচন্দ্রের সংগ্রহে। ছাত্র অবস্থাতেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং সেই টান থেকেই জ্যোতি বসু এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ও কর্মকাণ্ডের ওপর খবর ও ছবির কোলাজ করে ফেলেন কৃষ্ণবাবু। পরবর্তীতে এমনই কোলাজ তিনি গড়েছেন মমতা ব্যাণার্জী, মাদার টেরেজা এমনকি লেডি ডায়নার ওপরেও। তাঁর ধরে রাখা সংবাদ শিরোনাম আর সংবাদচিত্রের সংগ্রহে রয়েছে প্যালেষ্টাইন, উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো আন্তর্জাতিক বিষয়ও। বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে অন্তত দশখানা খবরের কাগজ থেকে পাঁচ দশক ধরে কীভাবে সময়ের ঐতিহাসিক দলিল গড়ে তোলা যায়, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

বর্তমানে নিজের এই সংগ্রহ রক্ষণাবেক্ষণ করা নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন মানুষটি। তাই ছেড়ে দিতে চাইছেন সংগ্রহের কাজ। তবে এখনও পর্যন্ত পরম যত্নে বড়ো আর্ট পেপারে আগলে রেখেছেন সংবাদ শিরোনাম এবং সংবাদচিত্রগুলি। তিনি বলেন, শুরুটা এত ভেবে করিনি কিন্তু ধীরে ধীরে বয়স যত বেড়েছে এর গুরুত্ব বুঝেছি আর তাই আরও বেশি করে মন দিয়ে করার চেষ্টা করেছি। এখন অবশ্য সোস্যাল মিডিয়া, নিউজ পোর্টাল আর হরেক মাধ্যমের কল্যাণে সংবাদ শিরোনাম আর সংবাদচিত্রগুলো ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখাটা বড়ো কোনো চাপের কাজ নয়। তাই আর বাড়াতে চাইছি না কোলাজ। তবে যেটুকু সংগ্রহ করেছি তা ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় তা নিয়ে সত্যিই চিন্তায় আছি। অনেকেরই পরামর্শ চাইছি যাতে আগামী প্রজন্ম ফেলে আসা সময়ের স্বাদটুকু পায় এই সংগ্রহের মাধ্যমে।’

- Advertisement -

এদিকে এই শিরোনাম ও ছবি সংগ্রহের মাঝেই জোগাড় করে ফেলেছেন দেশ ও দুনিয়ার অনেক নামী ও পুরোনো সংবাদপত্রের কপি। এই মানুষটি সংগ্রহে ‘সংবাদ প্রভাকর’ বা ‘হিকির বেঙ্গল গেজেট’ এর কপি যেমন রয়েছে তেমনই রয়েছে রাশিয়ান ‘প্রাভদা’, চিনের ‘পিপলস ডেইলি’ বা ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এর কপি। সব মিলিয়ে বলা যায় একটা খবরের কাগজ যেমন বহমান সময়কে তার বুকে ধরে রাখে তেমনই এই মানুষটি খবরের কাগজকে নিজের সংগ্রহে কোলাজ আকারে ধরে রেখেছেন সময়ের দলিল করে।

ছবি- নিজের সংরক্ষিত সংবাদ শিরোনাম এবং সংবাদচিত্রের সঙ্গে কৃষ্ণবাবু।

তথ্য ও ছবি- সপ্তর্ষি সরকার