রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : দোতলা ভবন আছে, চেয়ার আছে, টেবিল আছে। আছে সুইচ বোর্ড, লাইট বাল্ব, সাবমার্সিবল মোটর সবই। নেই বলতে বিদ্যুতের সংযোগটাই। একমাস বা এক বছরের বঞ্চনা নয়। পাঁচ বছর ধরে এভাবেই বিদ্যুৎহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে কদমতলি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দার স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার গুরুদাযিত্ব যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর, সেটাই এখন চরম অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে রয়েছে।

পুরাতন মালদার মহিষবাথানি গ্রাম পঞ্চায়েছের কদমতলি গ্রামেই রয়েছে কদমতলি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। পুরাতন মালদা শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থান এই গ্রামের। নিকটবর্তী হাসপাতাল বলতে পুরাতন মালদা পুরসভার মৌলপুরে অবস্থিত ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তাও প্রায় আট কিলোমিটার দূরে। গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নত করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের এপ্রিলে কদমতলি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয়। নতুনটোলা, পুরাতনটোলা, বালুয়াটোলা, গুজ্জরঘাটটোলা, কদমতলি, রাহুতগ্রাম সমেত আশপাশের প্রায় দশটি গ্রামের ভরসা এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। বিশেষত এলাকার প্রসূতি, মা ও শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন এখানে মা ও শিশুদের ভিড় লেগেই থাকে। তবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে কদমতলি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। উদ্বোধনের পর প্রায় পাঁচ বছর হতে চললেও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না আছে বিদ্যুৎ সংযোগ, না আছে পানীয় জলের ব্যবস্থা।

যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য পরিষেবায়। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ভবনটি দোতলা হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় ভবনের ভেতর আঁধারে ডুবে থাকে। মেঘলা দিন বা শীতের দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। গ্রীষ্মকালে গরমে হাঁসফাঁস করা ছাড়া উপায় থাকে না কারও। দুর্ভোগের শিকার হন রোগী ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীরাও। বিদ্যুৎহীনতার সঙ্গে যোগ হয়েছে পানীয় জলের সংকট। পরিস্রুত পানীয় জল দূরে থাক, সাবমার্সিবল পাম্পের জলও পাওয়া যায় না এখানে। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পেছনে নোংরা, কাদা জঞ্জালের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি নলকূপ। সেই নলকূপের জলই ভরসা মা, শিশু, রোগী সবার। ওই জল থেকে রোগ ব্যাধি ছড়ানোর আশঙ্কাও রয়েছে প্রবল।

উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এমন বেহাল দশা না মেটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার বহু বাসিন্দা। আদরি বিবি নামে এক গৃহবধূ জানালেন, আমার ছমাসের ছেলেকে নিয়ে এখানেই আসি। পালস পোলিও সমেত নানা টিকা নিতে হয়। আমার মতো অনেকেই আসেন এখানে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় খুব সমস্যা হয়। গরমের দিনে খুবই কষ্ট হয় আমাদের। পানীয় জলেরও কোনও ব্যবস্থা নেই এখানে। শুরু থেকেই বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সমস্যা থাকলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাগরি বিবি নামে অপর এক গৃহবধূ বলেন, গ্রামাঞ্চলের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার জন্যই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ ও পানীয় জল না থাকলে স্বাভাবিক পরিষেবা কি দেওয়া সম্ভব। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নতির কথা বললেও আসলে তা মানা হচ্ছে কই?

উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী জাহানারা বিবি বলেন, মাস দুয়েক আগে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বৈদ্যুতিক তার, সুইচ বোর্ড, লাইট বাল্ব এমনকি একটি সাবমার্সিবল পাম্পও বসানো হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না মেলায় সব অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। এবিষয়ে পুরাতন মালদার ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক শৌভিক দাস বলেন, ওই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন বিদ্যুৎ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যুৎ দপ্তর থেকে অনুমোদন এলে ওই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংযোগ দেওয়া হবে। যদিও এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রতিশ্রুতির কথা শুনলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। অগত্যা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভগ্নস্বাস্থ্যকেই মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।