জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : ১৯৬৮ সালে জলপাইগুড়ির বন্যার ৫১ বছর পেরোতে চলেছে। কিন্তু জলপাইগুড়ির বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা উদ্বেগজনক। ১৯৬৮ সালের ৪ অক্টোবর তিস্তা নদীর জলোচ্ছ্বাসে শহর জলপাইগুড়ি কার্যত জলের তলায় ছিল। বর্তমানেও তিস্তার রিভার বেড জলপাইগুড়ি শহর থেকে এক মিটারের বেশি উঁচু। সেচ দপ্তরের তরফে ঢাকঢোল পিটিয়ে জলপাইগুড়িতে ফ্লাড গেট তৈরির কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। ফ্লাড গেটের প্রস্তাবের ফাইল সেচ ভবনে লাল ফিতার বন্ধনে আবদ্ধ।

১৯৬৮ সালের বিধ্বংসী বন্যার পর উত্তরবঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন করা হয়েছিল। দুবছর আগে এই কমিশনকে অবলুপ্ত করা হয়েছে। কমিশনের কার্যকালের মেয়াদে তিস্তাকে ঘিরে মাস্টার প্ল্যানের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই মাস্টার প্ল্যানও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব সেচ বিভাগ তৈরি করে সেচ দপ্তর বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ তদারকি করছে। বন্যার ৫১ বছর পরও বন্যা নিয়ন্ত্রণে সেভাবে কোনো পরিকল্পনা না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ জলপাইগুড়িবাসী। সেচ দপ্তরের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার শান্তনু ধর বলেন, জলপাইগুড়ি শহরের মানুষকে বর্ষার মরশুমে বন্যা থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপর কাছে ফ্লাড গেটের প্রস্তাব করেছি। প্রস্তাবটি এখনও বিবেচনাধীন। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা অরুণাংশু ভৌমিকের বয়স ৮৭ বছর। তিনি বলেন, ১৯৬৮ সালের বন্যায় জলপাইগুড়ি শহরের বহু জায়গাতেই এক মানুষ সমান জল জমে গিয়েছিল। শহরের অর্থনীতি এই বন্যাই পঙ্গু করে দিয়েছে। বহু আবেদন-নিবেদন করার পরও জলপাইগুড়ি শহরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। ১৯৬৮ সালের বন্যায় প্রতিবেশী শিলিগুড়ি শহরের মানুষের কাছে জলপাইগুড়িবাসী কৃতজ্ঞ। কারণ বন্যার পরে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জলপাইগুড়ির বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিলিগুড়িবাসীই।

- Advertisement -

ষাট ছুঁইছুঁই জলপাইগুড়ি পুরাতন পুলিশলাইনের বাসিন্দা কল্যাণ দাস বলেন, বন্যার কারণে আমাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল। বিপন্ন মানুষের খাবারের সমস্যাই সেই সময় সবচেয়ে বেশি ছিল। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। ভূগোলবিদ ডঃ সুবীর সরকার বলেন, ১৯৬৮ সালের বন্যার ৫১ বছর পূর্তি হওয়ার মুখেও সমস্যা মেটাতে সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হল না। নদী লাগোয়া এলাকায় ব্যাপক আকারে বেআইনিভাবে জনবসতি গড়ে উঠেছে। জলপাইগুড়ির তিস্তা নদীর প্রধান বাঁধ পুরোপুরি অরক্ষিত। বাঁধের উপরে বেআইনিভাবে দোকানপাট তৈরি করা হয়েছে। এমনকি, বাঁধের কাছে বহু খাটাল রয়েছে। বাঁধের উপর দিয়ে ভারী পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করে। তিস্তাকে ঘিরে মাস্টার প্লানের কথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের বৈঠকে আলোচিত হলেও তা নিয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি। তিস্তার রিভার বেড জলপাইগুড়ি শহর থেকে এক মিটারেরও বেশি উঁচু। ভারী বর্ষণ হলে জলপাইগুড়ি শহরে জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বন্যার ৫১ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার মুখেও তিস্তাকে ঘিরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না হওয়ায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। মানুষকে উদ্বেগমুক্ত করতে সেচ দপ্তর কী পদক্ষেপ করে সেটাই এখন দেখার।