ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : জমি আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ না মেলায় পাঁচ বছরেও আলিপুরদুয়ারে তৈরি হয়নি কোনো সরকারি হোম। ফলে বিভিন্ন সময় উদ্ধার হওয়া শিশু, কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি ও আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আলিপুরদুয়ারে শিশুদের রাখতে একটি স্পেশাল অ্যাডপশন এজেন্সি বা সা-এর দাবি থাকলেও আজও তা পূর্ণ হয়নি। জেলায় নতুন সিডব্লিউসি গঠনের পর বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা শুরু করা হয়েছিল। জেলা শহরে একটি জমিও চিহ্নিত করে প্রশাসন। কিন্তু অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় এখনও আলিপুরদুয়ারে সরকারি হোম তৈরির কাজই শুরু করতে পারেনি জেলা প্রশাসন। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, কিশোর-কিশোরীদের আলাদা দুটি হোম তৈরির জন্য পূর্ত দপ্তরের কাছে প্রস্তাব পাঠানো আছে। রাজ্য থেকে অর্থ অনুমোদন মিললে তারাই হোম তৈরির কাজ করবে।

২০১৪ সালের ২৫ জুন পৃথক জেলার স্বীকৃতি পায় আলিপুরদুয়ার। জেলা গঠনের কিছুদিন পরে আলাদা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি বা সিডব্লিউসি গঠিত হয়। এই কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন কান্তিভূষণ মোহন্ত। প্রশাসন সূত্রের খবর, এরপরই আলিপুরদুয়ারে শিশুদের রাখতে একটি স্পেশাল অ্যাডপশন এজেন্সি বা সা এবং কিশোর-কিশোরীদের থাকার জন্য আলাদা করে দুটি হোম তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয। সিডব্লিউসি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ওই সময় আলিপুরদুয়ার শহরের বাবুপাড়া এলাকায় সরকারি জুভেনাইল হোম তৈরির জন্য প্রশাসন জমিও চিহ্নিত করেছিল বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। ঠিক করা হয়, সেখানে তিনতলা একটি হোম তৈরি হবে। নীচতলায় থাকবে সা। উপরের দুটি তলায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোরীদের রাখা হবে। পাশাপাশি খোঁজ চলতে থাকে ১৮ বছরের নীচে থাকা কিশোরদের হোম তৈরির জমিও। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, হোমটি তৈরির জন্য তিন কোটি টাকার বেশি একটি আর্থিক পরিকল্পনা পাঠানো হয় রাজ্যে। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই হোম তৈরির প্রক্রিযা থমকে যায়। যার ফলে আজ পর্যন্ত আর হোম তৈরির কাজ এগোয়নি।

- Advertisement -

এদিকে, সম্প্রতি আলিপুরদুয়ার সিডব্লিউসি-র মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে আগের কমিটি ভেঙে দিয়েছে স্টেট চাইল্ড প্রোটেকশন কমিটি। যতদিন না পর্যন্ত আলিপুরদুযারে নতুন কমিটি গঠন হচ্ছে ততদিন কোচবিহার সিডব্লিউসি-র চেয়ারম্যানকে এখানকার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিশু ও নারী পাচারের মতো বিষয়ে স্পর্শকাতর জেলায় সিডব্লিউসি না থাকা এবং সরকারি স্তরে কোনো জুভেনাইল হোম তৈরি না হওয়ায় বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আলিপুরদুয়ার সিডব্লিউসি-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান কান্তিভূষণ মোহন্ত বলেন, আমরা যখন দায়িত্বে ছিলাম তখন জেলা প্রশাসন জুভেনাইল হোম তৈরির জন্য উদ্যোগী হয়েছিল। শুনেছিলাম তখন হোম তৈরির জন্য কিছু টাকাও বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু এখন আর আমরা দায়িত্বে নেই। তাই হোম তৈরির বিষয়াটি জেলা প্রশাসনই ভালো বলতে পারবে।

সিডব্লিউসি সূত্রে জানা গিয়েছে, আলিপুরদুয়ারে সরকারি কোনো হোম না থাকায় উদ্ধার হওযা কিশোরদের জলপাইগুড়িতে ও কিশোরীদের কোচবিহারের বাণেশ্বরের একটি হোমে রাখা হয়। কিন্তু বেশি সমস্যায় পড়তে হয় উদ্ধার হওয়া শিশুদের নিয়ে। সিডব্লিউসি-র কর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকায় উদ্ধার হওয়া বারোটি শিশুর মধ্যে দুটি শিশু এই মুহূর্তে বাণেশ্বরে রয়েছে। বাকি সাতটি শিশু আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে রয়েছে। আর তিনটি শিশুকে মালদা ও বালুরঘাটে পাঠানো হয়েছে।

আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের সুপার চিন্ময় বর্মন বলেন, আমাদের হাসপাতালে সিডব্লিউসি-র পাঠানো সাতটি শিশু আছে। এর মধ্যে দুটি শিশুর বয়স দুই বছর হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালের পরিবেশে শিশুদের ঠিকমতো শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হচ্ছে না। এই অবস্থায় আলিপুরদুযারে হোম না থাকাটা একটা বড়ো সমস্যা। অবিলম্বে হোম তৈরি করা প্রয়োজন বলে হাসপাতাল সুপার জানিয়েছেন। সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসনের কর্তারাও। এ বিষয়ে জেলাশাসক সুরেন্দ্রকুমার মিনা বলেন, বর্তমানে হোম তৈরির কাজ কোন পর্যাযে আছে তা খোঁজ নিতে হবে। দ্রুত যাতে জেলায় জুভেনাইল হোম তৈরি করা যায় তার জন্য উদ্যোগী হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।