সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি : ২১ বছর আগে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে একটি অনাথ আশ্রম চালু করেছিলেন কুশমণ্ডিতে। কিন্তু এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্রম কিংবা সেখানকার আবাসিকদের জন্য বিন্দুমাত্রও সাহায্য করে না প্রশাসন। আক্ষেপের সুরে জানালেন আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত দত্ত। এ ব্যাপারে বিডিও শৈপা লামা জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি জেলাশাসকের নজরে এনেছেন।

১৯৯৮ সালে নীলকণ্ঠ স্বর্গ আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর গাজোল ব্লকের একটি অনাথ শিশুকে নিয়ে শুরু হয় পথচলা। বর্তমানে সেখানকার আবাসিক সংখ্যা ৩২। রঞ্জিতবাবু জানান, অনাথ ওই শিশুদের তিনবেলা খাবার সহ বাকি খরচ চালাতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে ওই ৩২ জন ছেলে এখন হাইস্কুলের দিকে পা বাড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যেই কুশমণ্ডি ব্লক প্রশাসন সহ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নানা সময় পাশে দাঁড়ালেও সারা বছর চলার জন্য কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। এমনকি মুখ ফিরিয়ে দেখে না প্রশাসনও। বিশেষ করে সকলের তিনবেলা খাবার জোগাড় করাই সবচেয়ে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও জানান, আশ্রমের জন্য বাগডুমা গ্রামের কাইচালু সরকার জমি দান করেন। কিন্তু সেই জমিতে আশ্রম তৈরি করার পরিকল্পনা শেষপর্যন্ত অধরাই থেকে যায়।

রঞ্জিতবাবু যখন চাকরি করতেন তখন সেই বেতনের টাকা দিয়ে চলত আশ্রম। কিন্তু এখন অবসর নেওয়ার পর বদলে গিয়েছে ছবিটা। এখন পেনশনের টাকায় চলে আশ্রমের খরচ। তাছাড়া ওই ছেলেদের দেখা ও পড়াশোনা করানোর জন্যও রয়েছেন গ্রামের তিন জন। তাঁদেরকেও বেতন দেওয়ার দায়িত্ব রঞ্জিতবাবুর। রঞ্জিত দত্তের বাড়ি বালুরঘাটে। দুজায়গাতেই বিনা পয়সায় এখনও বহু রোগীকে হোমিয়োপ্যাথি ওষুধ দেন তিনি। চিকিৎসা করেন আশ্রমের ছেলেদেরও। অনাথ শিশুদের জন্য দুবেলা ভাত ও খাবারের জোগানের জন্য ব্লক প্রশাসনের কাছে বহুবার আবেদন করেছেন। মিড-ডে মিলে যুক্ত করার আবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি বলে জানান রঞ্জিতবাবু। তাঁর আক্ষেপ সব স্কুলেই মিড-ডে মিল চলে। অথচ ৩২ জন অনাথ শিশুর জন্য ব্লক প্রশাসন মিড-ডে মিল চালু করতে পারল না। সব মিলিয়ে আশ্রমে রোজ খরচ হয় ১৫০০ টাকা। বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, জামাকাপড়, সাবান, রান্নার কাঠ সব মিলিয়ে বছর গেলে সেটা তিন লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি স্যানিটেশনের হালও খুব খারাপ। পাম্প মেশিন আছে কিন্তু জলের ট্যাংক ফুটো। শীঘ্রই একটি মার্ক-টু টিউবওয়েল দরকার।

শিক্ষকতার পাশাপাশি রেডিয়ো মেকানিক হিসাবেও হাতযশ রয়েছে রঞ্জিতবাবুর। সেখান থেকে যা আয় হয় তার পুরোটাই চলে যায় আশ্রমে। তিনি বলেন, শীত পড়লে কিছু বেসরকারি সংস্থা কখনও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওই অনাথ শিশুদের জন্য জামাকাপড়, জুতো নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু মূল জায়গায় ঘাটতিটা থেকে যায়। সেই চিন্তাই এখন বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত পুরো আশ্রমের ভারই তিনি একাই টেনেছেন। কিন্তু এখন বয়স হয়ে যাওয়ায় চিন্তা বেড়েছে। আশ্রমকে নিয়ে প্রশাসনিক কোনো সহায়তা না পেলে অদূর ভবিষ্যতে ওই অনাথ বাচ্চাগুলোর কী পরিণতি হবে, সেই চিন্তাই কুরে কুরে খাচ্ছে তাঁকে। কেন ৩২ জন অনাথ শিশুর দুবেলার খাবার ব্লক প্রশাসন দিতে পারবে না, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

কবি করুণাময় চক্রবর্তী বলেন, এমন ঘটনা আমাদের লজ্জা না দিয়ে পারে না। য়েকোনো স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করে ওই ছেলেদের খাবারের আয়োজন সহ সব কিছুই দিতেই পারে প্রশাসন। নীলকণ্ঠ স্বর্গ আশ্রমকে বিশেষ চোখে দেখা দরকার বলে দাবি জানান আরেক কবি গোবিন্দ তালুকদার। তিনি বলেন, মহকুমাশাসককে আমি নিজে অনুরোধ করব যাতে ওই আশ্রমের বাচ্চারা দুবেলা খাবার থেকে বঞ্চিত না হয়। এই প্রসঙ্গে কুশমণ্ডি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুনন্দা বিশ্বাস বলেন, নীলকণ্ঠ স্বর্গ আশ্রমের বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি। তবে আদৌ নীলকণ্ঠ স্বর্গ আশ্রমের হাল ফিরবে কিনা কিংবা ফিরলেও তা কবে হবে, এখন সেই দিকে তাকিয়ে রয়েছে চিত্ত বাসকে, সুব্রত হেমরম, অনিল কিসকুর মতো মা-বাপ হারানো ৩২ জন শিশু। যাদের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে রয়েছে প্রশাসনের সদিচ্ছার ওপর।