৭২ বছরেও বক্সা পাহাড়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই

304

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : আর দিন দুয়েক পর ৭৩তম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনে মেতে উঠবে গোটা দেশের মানুষ। আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা পাহাড়ের মানুষও স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করবেন। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্টকে সাজিয়ে তোলার তোড়জোড় চলছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৩ বছরেও বক্সা পাহাড়ে গড়ে ওঠেনি কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফলে বক্সা পাহাড়ের প্রায় তিন হাজার বাসিন্দা আজও স্থায়ী চব্বিশ ঘণ্টা স্বাস্থ্য পরিসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আছেন। তবে ব্রিটিশ আমলে বক্সা পাহাড়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিসেবার ব্যবস্থা ছিল বলে জানা গিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ধীরে ধীরে সেই পরিসেবা উঠে যায়। কিন্তু তারপর আজও বক্সা পাহাড়ের মানুষের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। স্বাস্থ্যকেন্দ্র না পেয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে পাহাড়বাসীর মধ্যে। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, শৌচাগার সহ কোনো পরিসেবাই আজও ঠিকমতো পান না বক্সার বাসিন্দারা বলে অভিযোগ। স্বাভাবিকভাবেই দেশের স্বাধীনতার ৭২ বছরে গোটা বক্সা পাহাড় আজও যেন পরাধীন আছে বলে বাসিন্দারা মনে করেন।

রাজ্যের অন্যতম প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকা আলিপুরদুযারের বক্সা পাহাড়। এই পাহাড়ের লেপচাখা, চুনাভাটি, আদমা সহ বেশ কয়েকটি দুর্গম ও প্রত্যন্ত গ্রাম আছে যেখানে আধুনিক সমাজের অনেক পরিসেবাই আজও পৌঁছায়নি। শীতের সময় পাহাড়ি পথ কিছুটা ঠিক থাকলেও বর্ষাকালে পাহাড় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তখন একটি গ্রাম থেকে আরেকটি গ্রামের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে শিশু, বয়স্ক ও বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলারা সবচেয়ে সমস্যায় পড়েন। অসুস্থ মানুষকে স্থানীয়রাই মাচা তৈরি করে কাঁধে করে পাহাড় থেকে সমতলে নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য। অনেকেই চিকিৎসার অভাবে পাহাড় থেকে নামার রাস্তাতেই মারা যাচ্ছেন বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বিশেষ করে রাতের দিকে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ইষ্টনাম জপ করা ছাড়া তাঁর আর কোনো পথ থাকে না। সকাল হলে ওই রোগীকে পিঠে চাপিয়ে লতাবাড়ি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসেন বাসিন্দারা।

বক্সা পাহাড়ে প্রায় ১৩টি গ্রাম আছে। এই ১৩টি গ্রামে প্রায় তিন হাজার মানুষ বসবাস করেন। দীর্ঘদিন থেকে পাহাড়ে বাসিন্দারা থাকলেও সরকারি বিভিন্ন সুযোগসুবিধা থেকে আজও তাঁরা বঞ্চিত বলে অভিযোগ। বিশেষ করে পাহাড়ের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এখানে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলুক সরকার। কিন্তু স্বাধীনতার ৭২ বছর পরেও বক্সা পাহাড়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ব্রিটিশ আমলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিসেবার ব্যবস্থা ছিল বক্সা পাহাড়ে। সেইসময় জটিল কিছু হলে বক্সা পাহাড়ের মানুষ সমতলে নেমে আসতেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বক্সা পাহাড়ে ওই চিকিৎসা পরিসেবা বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ইন্দ্রবাহাদুর থাপা, টিনু ডুপ্পা, প্রকাশ ছেত্রী জানান, দেশ স্বাধীন হলেও আজও যেন তাঁরা পরাধীনভাবে বেঁচে আছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এখানে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলুক সরকার। কিন্তু আজও সেই দাবি পূরণ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে পাহাড়ের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে রোগীকে কাঁধে করে পাহাড় থেকে নামিয়ে সমতলে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। বিশেষ করে বয়স্ক ও গর্ভবতীদের নিয়ে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হয় বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

এদিকে, বক্সা পাহাড়ের বাসিন্দাদের এই সমস্যার কথা ভেবে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর বিভিন্নভাবে সেখানে স্বাস্থ্য পরিসেবা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও বক্সা পাহাড়ে অস্থায়ীভাবে স্বাস্থ্য পরিসেবা দিচ্ছে। আবার বছরের বিভিন্ন সময় বক্সা পাহাড়ের সমতলে স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজনও করে বিভিন্ন সংগঠন। জানা গিয়েছে, আগামী ১৫ অগাস্ট সানতালাবাড়িতে স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করেছে আলিপুরদুয়ারের একটি সংগঠন। সোসাইটি ফর ডুয়ার্স কমিউনিকেশন অ্যান্ড কালচারালের সভাপতি অধ্যাপক রাজীব ভৌমিক বলেন, বক্সা পাহাড়ের বাসিন্দারা সত্যিই আজও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বঞ্চিত। তাই পাহাড়ের মানুষের কথা ভেবে প্রতিবারই আমরা সানতালাবাড়িতে স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করি। ডাক্তারদের সংগঠন আইএমএ-র তরফ থেকেই ওই শিবিরে সহযোগিতা করা হয়। স্বাস্থ্য শিবিরের পাশাপাশি ১৫ অগাস্ট ঐতিহাসিক বক্সায় স্বাধীনতা দিবসও উদ্‌যাপন করা হয়।

বক্সা পাহাড়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিষয়ে আলিপুরদুয়ারের ডেপুটি সিএমওএইচ-২ সুবর্ণ গোস্বামী বলেন, দুর্গম পাহাড়ি পথের জন্যই হয়তো বক্সা পাহাড়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি হয়নি। তবে আমাদের জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মীরা ওই দুর্গম পথ পার করেও বক্সায় স্বাস্থ্য পরিসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। শিশুদের টিকাকরণ থেকে গর্ভবতীদেরও বিভিন্ন পরিসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা। তবে সেখানে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা যায় কিনা, সে বিষয়ে উপরমহলে একটি প্রস্তাব পাঠানো হবে বলে ডেপুটি সিএমওএইচ-২ জানিয়েছেন।