ভালুকায় ১৭টি গ্রাম সংসদে কোনও হাইস্কুল নেই

মুরতুজ আলম, সামসী : বিহার সীমান্ত লাগোয়া হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের ভালুকা অঞ্চল অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। ২০১১ সালের জনগণনা থেকে জানা যায়, এখানে ৩৫ হাজার লোকের বসবাস। রাজ্যের অন্য পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে যখন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে, তখন ভালুকা পঞ্চায়েতে এখনও রাস্তাঘাট ও পানীয় জলের সমস্যা রয়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এই অঞ্চলে কোনও হাইস্কুল নেই। ভালুকার এক প্রান্তে জগন্নাথপুরে একটিমাত্র উচ্চমাধ্যমিক হাই মাদ্রাসা আছে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিকবার এলাকায় হাইস্কুল তৈরির দাবিতে প্রশাসনের কাছে দরবার করেছেন। এই পরিস্থিতিতে ভালুকার বাসিন্দাদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ভালুকা পঞ্চায়েতের আওতায় ১৭টি গ্রাম সংসদ রয়েছে। কিন্তু এলাকায় প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হচ্ছে ১১টি। ইতিমধ্যে পারভালুকা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি একেবারে উঠে গিয়েছে। গতবছর বন্যার সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবনটি ফুলহরে তলিয়ে যায়। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয় ভবন তলিয়ে যাওয়ার পর ফের নতুন ভবন তৈরি করা হয়নি। এদিকে, জগন্নাথপুর গ্রামে ৮ হাজার লোকের বাস। কিন্তু এই এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা রয়েছে দুটি। একই চিত্র ধরা পড়বে ফতেপুর, ভালুকা সহ অন্য গ্রাম সংসদগুলিতেও।

- Advertisement -

ফতেপুরে ১২ হাজার লোক বাস করেন। কিন্তু এখানেও দুটি প্রাথমিক স্কুল রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাথমিকে পাশ করার পর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার জন্য বিপুল সংখ্যক পড়ুয়াকে জগন্নাথপুর হাই মাদ্রাসার ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার অনেক মাধ্যমিক পাশ পড়ুয়া একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় সমস্যায় পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে পড়ুয়াদের ছুটতে হয় চাঁচল, রতুয়া, সামসী, হরিশ্চন্দ্রপুর বা জেলা সদরের দিকে।

এবিষয়ে বোরনাহীর বাসিন্দা শাহিদুল ইসলাম বলেন, ভালুকা একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল। মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তর। আমাদের আশা ছিল, মুখ্যমন্ত্রী আমাদের এলাকার উন্নয়নে বিশেষ নজর দেবেন। এলাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল তৈরি হবে। কিন্তু কোথায় কী? বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব আমাদের এলাকাকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। এলাকার কচিকাঁচারা শিক্ষা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। ফলে এলাকায় অসামাজিক কাজকর্ম বাড়ছে। নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।

হাতিছাপার বাসিন্দা ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র মহম্মদ সেলিম বলেন, এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে মানুষ প্রতিদিন পিছিয়ে পড়ছে। যার জেরে সমাজে সচেতনতার অভাব বাড়ছে। রাজ্য সরকার বাল্যবিবাহের মতো নিকৃষ্ট প্রথা আটকাতে তৎপর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু শিক্ষার অভাবে এই এলাকায় প্রতিনিয়ত বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা ঘটছে। এদিকে এলাকার বাসিন্দারা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির। ফলে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের বেশি টাকার বিনিময়ে বেসরকারি স্কুলে পাঠাতে পারছেন না। এই অবস্থায় রাজ্য সরকার যদি এই এলাকার দিকে বিশেষ দৃষ্টি না দেয় তবে নতুন প্রজন্ম সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

টেংঠাঘাটের বাসিন্দা আবু বাক্কার বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার পর উচ্চশিক্ষার জন্য এলাকায় সুযোগ নেই। ফলে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর গৌড় মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু বাইরে গিয়ে সবার পড়াশোনা করার সামর্থ্য থাকে না। তাই বেশিরভাগ পড়ুয়াই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এর জেরে স্কুলছুটের সংখ্যাও বাড়ছে। আবু বাক্কারের সঙ্গে একমত হয়েছেন টেংঠাঘাটের আরও দুই বাসিন্দা পাপ্পু মণ্ডল ও গৌরাঙ্গ মণ্ডল। পাপ্পুবাবু বলেন, হাইস্কুল না থাকায় এলাকার ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্কুলের অভাবে প্রাথমিক পাশ করার পর অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে তারা বাইরে শ্রমিকের কাজ করতে চলে যাচ্ছে।

ফতেপুরের বাসিন্দা জাহাঙ্গির আলম বলেন, এলাকার বাসিন্দারা কেউই আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। ফলে পড়াশোনার জন্য বাচ্চাদের দূরে কোথাও পাঠাতে পারছেন না। তাই দিন দিন শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। জগন্নাথপুরের বাসিন্দা পেশায় অধ্যাপক গোলাম মর্তুজা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে এলাকার জনগণের মধ্যে এখনও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। যার দরুণ অনেকেই গুজবে কান দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

কড়িয়ালি চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক মুনিরুল ইসলাম বলেন, ভালুকা পঞ্চায়েতে দুটি জুনিয়ার হাইস্কুল রয়েছে। একটি ফতেপুর ও আরেকটি হাতিচাপায় রয়েছে। ছাত্রর সংখ্যা বাড়লেই স্কুলগুলিকে হাইস্কুলে উন্নীত করা হবে। এবিষয়ে হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক মোস্তাক আলম বলেন, ভালুকায় একটিও হাইস্কুল নেই। এটির জন্য দায়ী রাজ্য সরকারের উদাসীনতা। লোক সংখ্যার অনুপাতে এখানে কমপক্ষে দুটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল তৈরি করা দরকার। আমি এবিষয়ে শিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে কথা বলব।

এপ্রসঙ্গে হরিশ্চন্দ্রপুরের বাসিন্দা তথা জেলা পরিষদের নারী ও শিশু কর্মাধ্যক্ষ মর্জিনা খাতুন বলেন, এলাকাবাসীর শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য ভালুকায় শীঘ্রই হাইস্কুল তৈরি করা দরকার। আমি এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলব। যত দ্রুত সম্ভব ভালুকায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল গড়ে তোলার চেষ্টা করব।