শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : শীতের আভাস মিলতেই শিলিগুড়িতে একসময় দুপুরের পরেই সূর্যের ডুবতে থাকা আলোয় রংবেরঙের ইচ্ছে ঘুড়ি উড়ান দিত। চাঁদিয়াল, পেটকাটি-র লড়াইয়ে মাঝেই হঠাৎ করে ভেসে আসত ভোকাট্টা- জয়ধ্বনি। কিন্তু এখন শীতের শিলিগুড়ির আকাশ ফাঁকা। সেইসব ঘুড়ি আর নজরেই পড়ে না। শোনা যায় না তৃপ্তির ভোকাট্টা।

একসময় বিভিন্ন রংবেরঙের ঘুড়ি, লাটাই সাজিয়ে বসলেও মহাবীরস্থান মার্কেটের ব্যবসায়ী অজিত রায়ের দোকানে এখন দশকর্মার জিনিসপত্রের মধ্যে কোথাও যেন সেই শূন্যতা বিরাজ করে। অজিতবাবুকে প্রশ্ন করতেই গলায় যেন হতাশার সুর। তিনি বলেন, একসময়ে ঘুড়ি কিনতে কচিকাঁচাদের ভিড় জমত। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে জীবনযাত্রা পালটানোয় ঘুড়ি ব্যাকডেটেড হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, গত চারবছর ধরে ঘুড়ি আনাই বন্ধ করে দিয়েছি। ঘুড়ি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন আরেক ব্যবসায়ী মনোতোষ দাস। তিনি বলেন, শহর আধুনিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই আধুনিকতার সঙ্গে আমরা কোথাও আমাদের ছেলেবেলার ঐতিহ্য ভুলে যেতে বসেছি। শৈশব মন এখন মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্দি। তবে এখনও নিজের ছেলেবেলার আনন্দ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ঘুড়ির খোঁজে বেরিয়ে পড়েন বছর ষাটের প্রশান্ত দাস, অরূপ বসাকের মতো শহরের একটা অংশের মানুষ।

এই মানুষের আশায় এখনও তাই দোকানে কয়েকটি ঘুড়ি সাজিয়ে রাখেন সুপ্রতিম মুখোপাধ্যায়ে মতো দোকানদাররা। তাই এদিন তাঁর কাছে নাতিকে নিয়ে ঘুড়ি কিনতে এসে পুরোনো দিনের স্মৃতি হাতড়ালেন প্রশান্তবাবু। তিনি বলেন, একসময়ে দিনের পর দিন সুতোতে মাঞ্জা দিতাম। অবসর সময় পেলে ঘুড়ি উড়িয়ে বন্ধুদের মধ্যে মিষ্টি লড়াইয়ে যে কী আনন্দ হত তা আর ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তবে এখনকার নতুন প্রজন্মের কাছে পড়াশোনা, টিউশনের চাপে আগের মতো সময় নেই। তিনি বলেন, তবে ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটানোর দায়িত্ব যে আমাদেরই। তাই নাতি অবসর সময় পেলেই আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের সময়কার আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করি। এই কথা শুনে সুপ্রতিমবাবু বলে ওঠেন, গত কুড়ি বছর ধরে ঘুড়ি বিক্রি করে আসছি। চোখের সামনে ঘুড়িকে হারিয়ে যেতে দেখলাম। তবু এখনও প্রশান্তবাবুদের হাত ধরে এই শহরে ঘুড়িকে টিকিয়ে রাখার লড়াই করে চলেছি।