পুজোর মুখেও বরাত মেলেনি, করোনা কাঁটায় শুনসান তাঁতিপাড়া

রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : কাঁচামালের জোগান নেই। মেলেনি উৎপাদনের বরাত। জোটেনি সরকারি ভাতাও। তাই ঘোর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পুরাতন মালদার তাঁতিপাড়ার তাঁত শিল্পীদের। পুজোর আগে তাঁতের খটাখট আওয়াজে যেখানে গোটা পাড়া মুখর থাকত, সেখানে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা।

কাশফুল, ঢাকের বোল, মহালয়ার মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে শুরু হয়ে গিয়েছে মায়ের বোধন। এখন মাঝে কয়েকটা দিনের অপেক্ষা। তারপরেই আপামর বাঙালি মা দুর্গার উৎসবে মেতে উঠবে। তবু এই উৎসব আবহেও মন ভালো নেই তাঁতিপাড়ার শিল্পীদের। কাঁচামালের অভাব আর মহাজনেদের কাছ থেকে বরাত না আসায় আশঙ্কায় দিন কাটছে তাঁত শিল্পী পরিবারগুলির। করোনা অতিমারির কারণে দেশে দীর্ঘ লকডাউন হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হওয়ায় এখন আনলক পর্ব চলছে। তবে সব কিছু কবে আবার আগের মতো স্বাভাবিক হবে, সেবিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই। লকডাউনের কারণে অনেকে কাজ হারিয়েছেন, অনেকে আবার বদলে ফেলেছেন নিজেদের জীবিকা। আবার অনেকের জীবনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাঁত শিল্পীদের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। করোনার প্রভাব পড়েছে তাঁদের জীবিকাতেও। তাই পুজোর মরশুমেও মন ভালো নেই তাঁত শিল্পীদের। পুরাতন মালদার সাহাপুরের তাঁতিপাড়ার শিল্পীদের তাই মন খারাপ।

- Advertisement -

একসময় এই এলাকায় প্রতিটি ঘরেই তাঁতের কাপড় বোনা হত। তাঁতিপাড়ার শতাধিক পরিবার তাঁত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে সময়ে সঙ্গে সঙ্গে জীবিকা বদল করে ফেলেছেন অনেকে। এখন হাতেগোনা কিছু পরিবার তাঁতের কাজ করে থাকেন। বছরভর তেমন কাজের চাপ না থাকলেও পুজোর আগে অবশ্য কাপড় বোনার বরাত মিলতে শুরু করে। মহাজনেরা সুতো দিয়ে যান কাপড় তৈরির জন্য। তাই দিয়ে তাঁতে কাপড়, গামছা তৈরি হয়। তবে এবছর করোনার দাপটে সেই বরাত মেলেনি বলে জানালেন তন্তুবায়রা। এখনও পর্যন্ত মহাজনদের কাছ থেকে কোনও অর্ডার না আসায় ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের। কেষ্ট তাঁতি, শকুন্তলা দাসরা জানালেন, তাঁরা মূলত তাঁতের ও তসরের শাড়ি, ওড়না ও গামছা তৈরি করেন। একটি কাপড় তৈরি করতে সময় লাগে তিন থেকে চারদিন। এক দিনে বেশ কয়েকটি গামছা তৈরি হয়। এই কাজের কাঁচামাল আসে বিহারের ভাগলপুর ও ওডিশা থেকে। মালদা ও আশপাশের জেলার মহাজনরা হচ্ছেন তাঁদের ক্রেতা। মরশুমের শুরুতেই মহাজনেরা শিল্পীদের অগ্রিম অর্থ ধার হিসাবে দিয়ে যান। উৎপাদিত জিনিস মহাজনদের মারফতে জেলার বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়।

কেষ্টবাবু স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, অতীতে তাঁত শিল্পের কদর ছিল গোটা রাজ্য জুড়ে। তখন দিনরাত প্রতিটি ঘরে শাড়ি-কাপড় তৈরির কাজ চলত। মহাজনদের আসা-যাওয়া আর মাকুর (তাঁত যন্ত্র) শব্দে গোটা পাড়া গমগম করত। এখন সেসব অতীত, তাঁত শিল্পের সোনালি দিন হারিয়ে গিয়েছে। বাজারে সস্তায় রকমারি শাড়ি চলে আসায় কদর কমেছে তাঁতের শাড়ির। মাকুর যন্ত্রে (হাতে চালিত কাঠের যন্ত্র) একটি শাড়ি তৈরি করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। আর পাওয়ার লুম (ইলেক্ট্রিক চালিত মেশিন) যন্ত্রে একদিনে তিন-চারটি শাড়ি উৎপাদন করা যায়। ফলে তার দাম কম হয়। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় তাঁতের শাড়ির কদর কমেছে বাজারে। তবু কোনওরকমে কাজ করছিলাম। তবে এবার করোনার জন্য কোনও মহাজন এখনও কাজের বরাত দেননি। কীভাবে পেট চলবে, জানি না।

শকুন্তলা দাস জানান, পুজো চলে এল। অথচ এখনও আমাদের হাতে কোনও কাজ নেই। করোনা ও লকডাউনের কারণে ভিনরাজ্য থেকে কাঁচামাল আসছে না। উৎসবের অনিশ্চয়তার কারণে বরাত আসেনি মহাজনদের কাছ থেকেও। ফলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। কেষ্ট তাঁতি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, এই অনিশ্চয়তার কারণে বংশপরম্পরার এই পেশা থেকে মুখ ফেরাছে বর্তমান প্রজন্ম। আজকের প্রজন্মের ছেলেরা অন্য কাজকে জীবিকা হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। শিল্পীদের ক্ষোভ, অন্য শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা সরকারি ভাতা পেলেও আমরা সেরকম কোনও ভাতা পাই না। স্বভাবতই পুজোর আগে মন ভালো নেই তাঁতিপাড়ার কারও।