অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পরিকাঠামো তৈরি হয়নি উত্তরবঙ্গে

451

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : উত্তরবঙ্গে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সরকারি কোনো পরিকাঠামো নেই। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ হোক বা মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অথবা কোচবিহার মেডিকেল কলেজ কোনো জায়গাতেই এখনও এই পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই উত্তরবঙ্গের জেলা হাসপাতাল বা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলিতেও এই পরিকাঠামো নেই।  অথচ শিলিগুড়ির মেয়ে মল্লিকার অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত কলকাতা সহ গোটা রাজ্যেই হইচই ফেলে দিয়েছিল। মৃত্যুপথযাত্রী কোনো মানুষকে অন্যের অঙ্গ দিয়ে কলকাতায় বাঁচানো সম্ভব হলেও উত্তরবঙ্গে এখনই সেই সুবিধা পাওযা যাচ্ছে না। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অতীতে একটি আই ব্যাংক থাকলেও তা এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বেসরকারিভাবে শিলিগুড়িতে লায়ন্স ক্লাবের একাধিক আই ব্যাংক রয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের বাকি কোনো জেলায় সেটাও নেই। উত্তরবঙ্গের মানুষ কবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য পরিকাঠামো পাবেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে। যার কোনো জবাব নেই এখানকার স্বাস্থ্যকর্তাদের কাছে।

উত্তরবঙ্গে বর্তমানে চারটি মেডিকেল কলেজ এবং প্রতিটি জেলাতেই জেলা হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ১৯৬৮ সালে স্থাপিত হয়েছে এই মেডিকেল কলেজ। ২০১১ সালে মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল তৈরি হয়। চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই চালু হয়েছে রায়গঞ্জ এবং কোচবিহার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পরিকাঠামো তৈরি হয়নি।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১৯৮০ সালে একটি আই ব্যাংক তৈরি হয়। আই ব্যাংকের কাজের জন্য নিয়ম মেনে একটি গাড়ি, একটি স্থায়ী টেলিফোন নম্বর যেমন ছিল, তেমনই আই ব্যাংক চালানোর জন্য চিকিৎসকের পাশাপাশি অপারেশন থিয়েটারের সহকারী (ওটি অ্যাসিস্ট্যান্ট), অপটোমেট্রিস্ট, নার্স সহ অন্যান্য কর্মীও দেওযা হয়েছিল। স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে আই ব্যাংকের জন্য বিশেষ আর্থিক সহযোগিতাও করা হত। তবে, কর্নিয়া সংরক্ষণ করে রাখার মতো কোনো ব্যবস্থা এখানে কোনোদিনই ছিল না। ফলে চক্ষুদানের অঙ্গীকার করে কেউ মারা গেলে খবর পাওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যেই আই ব্যাংক থেকে গাড়ি গিয়ে সেই মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া তুলে এনে অন্যের শরীরে বসাতেন। অনেক সময় কর্নিয়া তুলে নিয়ে এলেও প্রতিস্থাপনের সুযোগ না থাকায় সেই কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বেশ কয়েক বছর এভাবেই আই ব্যাংক চলার পরে ১৯৯৫-৯৬ সাল নাগাদ আই ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এখনও শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের সব জেলাতেই মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করছেন অনেকে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে অনেকে মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু তাতে লাভ কী হচ্ছে? সাধারণ মানুষ থেকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি একসুরে বলছে, কিছুই না। আজ পর্যন্ত মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারকারী অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর দেহ কে নেবেন? কোথায় দান করবেন? এখানে তো কোনো পরিকাঠামোই নেই।

আলিপুরদুযারের সিএমওএইচ ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী জানিয়েছেন, গোটা জেলার কোথাওই অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা নেই। কোচবিহার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার ডাঃ রাজীব প্রসাদ বলেন, আমাদের মেডিকেল  কলেজ নতুন তৈরি হয়েছে। এটা তো ঠিকই যে কলকাতায় মানুষ অঙ্গদানের সুযোগ পাচ্ছেন, তাহলে উত্তরবঙ্গে কেন সেটা পাওয়া যাবে না? এখানেও এই পরিকাঠামো নিশ্চয়ই তৈরি হবে। তবে, অঙ্গদানের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা আগে বাড়াতে হবে। মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার ডাঃ অমিত দাঁ বলেন, মালদা মেডিকেলে অঙ্গদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ সেই পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। আশা করছি আগামীতে এই পরিকাঠামো তৈরি হবে।উত্তরবঙ্গ মেডিকেলের চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, ৫০ বছর পেরিয়ে আসা এই মেডিকেলে অনেক আগেই এমন উন্নত পরিকাঠামো তৈরি হওযা উচিত ছিল ঠেখানে কিডনি, লিভার সহ অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু এখানে অতীতে চালু থাকা আই ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওযায় সামগ্রিক অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিষয়ে হতাশ এখানকার চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, সবচেয়ে আগে চোখ এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা এখানে করা প্রয়োজন। কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে গেলে আবার নেফ্রোলজি বিভাগ আগে তৈরি করতে হবে, যা এখানে নেই। পাশাপাশি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জনও প্রয়েজন। কেননা যে কোনো সার্জন একজনের শরীর থেকে কিডনি তুলে এনে অন্যজনের শরীরে বসাতে পারবেন না। তার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার কৌশিক সমাজদার বলেন, এখানে ব্যবস্থা নেই। তবে সুপারস্পেশালিটি ব্লক তৈরি হলে তখন হতে পারে। তবে সরকারেরও পলিসি থাকা দরকার। মানুষের সচেতনতা দরকার।