পরিস্রুত পানীয় জল পায় না আড়াই হাজার মানুষ

জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা : ভূগর্ভস্থ জলে মিশে রয়েছে আর্সেনিক, ফ্লোরাইডের মতো বিষ। এই জল পান করা মানেই মৃত্যুকে আমন্ত্রণ। মানুষকে ভয়াবহ এই বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে গ্রামে বসানো হয়েছিল আর্সেনিকমুক্ত পানীয় জলাধার। এই জলাধার থেকেই যদুপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের চারটি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার মানুষ পানীয় জলের পরিসেবা পেত। গ্রাম পঞ্চায়েতের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু জলাধার চালুর সাত মাসের মধ্যেই অজানা কারণে বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটি। ঠিক কী কারণে সেটি বন্ধ, তা জানে না গ্রামবাসীরা। এভাবেই অতিক্রান্ত প্রায় চার বছর। প্রকল্প গৃহে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। পড়ে নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। যদুপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান অবশ্য এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের ঘাড়েই দোষ চাপিয়েছেন। তিনি বলেন, এই ধরনের প্রকল্পের বিদ্যুতের খরচ গ্রামবাসীকেই বহন করতে হয়। গ্রামবাসীরা সেই বিল পরিশোধ করেনি বলেই লাইন কেটেছে বিদ্যুৎ দপ্তর। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।

ইংরেজবাজারের যদুপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত স্কুলপাড়া, মাঝাটোলা, ঘোনটোলা, পশ্চিমপাড়া এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস। মালদা শহরের সংলগ্ন এলাকা বলে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রার ধরণ অনেকটাই শহুরে প্রকৃতির। জেলার আর্সেনিকপ্রবণ ব্লকগুলির মধ্যে কালিয়াচক, মানিকচকের পরেই ইংরেজবাজারের স্থান। ইংরেজবাজারের ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিকের পাশাপাশি ফ্লোরাইডও মিশে রয়েছে। ফলে সরাসরি ভূগর্ভস্থ জল পান করলে ঝুঁকি থেকে যায়। এখনও মালদা শহরের বাড়ি বাড়িতে পরিস্রুত পানীয় জল পেঁছে দিতে ব্যর্থ ইংরেজবাজার পুরসভা। শহরের মানুষ আর্সেনিক ও ফ্লোরাইডের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পানীয় জল কিনে খায়। একই অবস্থা ইংরেজবাজারের গ্রামাঞ্চলগুলিতেও। যদুপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে প্রায় পাঁচ বছর আগে স্কুলপাড়ায় একটি পরিস্রুত পানীয় জলাধার তৈরি করা হয়। বসানো হয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। এই জলাধার থেকেই চারটি গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার মানুষ পানীয় জল সংগ্রহ করত। কিন্তু এই জলাধার বেশিদিন চলেনি। চালু হওয়ার সাত মাসের মধ্যেই জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ৪ বছর প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। এর মাঝে বোর্ড ও জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন হলেও প্রকল্পটি ফের চালু করার ব্যাপারে তারাও উদ্যোগী হয়নি বলে অভিযোগ।

- Advertisement -

স্থানীয় বাসিন্দা মলিনা বানু বলেন, পরিস্রুত এই পানীয় জলাধারটি চালু হওয়ার সাত মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। তারপর চার বছর কেটে গেছে। পঞ্চায়েত প্রধান বা স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য ঘুরেও তাকায়নি। আমরা এখন ৩৫ টাকা দিয়ে পরিস্রুত পানীয় জলের জার কিনে জল পান করি। অর্থাৎ মাসে হাজার টাকা পানীয় জল কিনে খাওয়ার জন্য ব্যয় করতে হয়। এই জলাধারটি চালু হয়ে গেলে আমাদের আর জল কিনে খেতে হবে না। আমরা চাই প্রধান বিষয়টি দেখুক। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, জলাধারটি বন্ধ হয়ে রয়েছে প্রায় চার বছর ধরে। অথচ এনিয়ে পঞ্চায়েত কিছু করছে না। আমাদের জল কিনে খেতে হচ্ছে। না হলে আর্সেনিকযুক্ত জল পান করতে হবে। তাতে রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষ প্রাণে বাঁচতেই পরিস্রুত পানীয় জলের জন্য ৩৫ থেকে ৪০ টাকা করে খরচ করতে হচ্ছে। গ্রামের সাধারণ গরিব মানুষের জন্য এই টাকা খরচ করা অত্যন্ত কঠিন। আমরা চাই জলাধারটি চালু করতে প্রধান পদক্ষেপ করুন।

বিকল জলাধার প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে চাননি স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যা জিন্নাফার বেগম। গ্রামবাসীদের ক্ষোভ থেকে নিজেকে আড়ালেই রাখতে চেয়েছেন তিনি। তবে পঞ্চায়েত প্রধান আয়ো ইয়াসমিন জানিয়েছেন, জলাধারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারাই দাযী। জলাধার চালু রাখতে হলে বিদ্যুতের খরচ বহন করতে হবে গ্রামবাসীকেই। এই বিল পঞ্চায়েতের তরফে দেওয়ার কোনো জায়গা নেই। প্রতিটি বাড়ি থেকে পাঁচ টাকা, ১০ টাকা করে দিলেই বিল পরিশোধ করা যায়। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে হয়তো এতদিন জলাধারটিও চালু থাকত।