শুভঙ্কর চক্রবর্তী : খাদ্য দপ্তরের নিয়ম বলছে, অন্ত্যোদয় অন্নপূর্ণা যোজনা (এএওয়াই)-র র‌্যাশন কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ১৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে পরিবারপিছু ১ কেজি করে চিনি পাবেন। চাল, গম বা আটা নিয়ে নানা অভিযোগের মাঝে কার্যত ধামাচাপা পড়েছে সেই কথা। র‌্যাশন থেকে চিনি দেওয়া হচ্ছে না বলে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহকরা। তাঁদের বক্তব্য, সরবরাহ নেই বলে দাবি করে অনেক জায়গাতেই ডিলাররা চিনি দিচ্ছেন না।

যদিও বিভিন্ন জেলার খাদ্য নিয়ামকরা জানিয়েছেন, র‌্যাশনে চিনির সরবরাহে কোনও ঘাটতি নেই। অভিযোগ খতিয়ে দেখে কড়া পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই নানা অভিযোগে উত্তর দিনাজপুরে ১২ জন ডিলারকে শোকজ করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ামক। প্রতিটি দোকানে কোনও প্রকল্পের কার্ডধারীরা কত পরিমাণে কী কী খাদ্যদ্রব্য পাবেন তার তালিকা ঝুলিয়ে দেবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আলিপুরদুয়ার, কোচবিহারে। দার্জিলিংয়ে দোকানে দোকানে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে চিনির বিষয়ে খোঁজ নিতে আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য দপ্তর। উত্তর দিনাজপুরের খাদ্য নিয়ামক অভিজিৎ ধারা বলেন, ইতিমধ্যে আমরা নানা অনিয়মের অভিযোগে ১২ জন ডিলারকে শোকজ করেছি। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। জেলায় চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। যাঁরা নিয়ম মেনে চিনি দেবেন না তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আলিপুরদুয়ারের জেলা খাদ্য নিয়ামক প্রেসিকা মোক্তান বলেন, চিনি নিয়ে লিখিত অভিযোগ এখনও পাইনি। যাঁরা চিনি পাচ্ছেন না তাঁরা সরাসরি খাদ্য দপ্তরে অভিযোগ জানাতে পারেন। আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করব।

- Advertisement -

চিনি নিয়ে ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে বিজেপিও। দলের রাজ্য সম্পাদক রথীন বসু বলেন, র‌্যাশনে সীমাহীন দুর্নীতি চলছে। সাধারণ মানুষ ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বহু জায়গাতেই গ্রাহকদের চিনি দেওয়া হচ্ছে না। সেই চিনি বাইরে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা কড়া পদক্ষেপ চাই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তিনি বলেন, বিজেপি নেতারা ঘরে বসে থেকে কী বললেন তার কোনও গুরুত্ব নেই। তবে সমস্ত ডিলারকে সতর্ক করা হয়েছে। আধিকারিকদের নিয়মিত অভিযান চালাতেও নির্দেশ দেওয়া আছে। কোথাও বেনিয়ম ধরা পড়লেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে অভিযুক্ত ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করব আমরা।

খাদ্য দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, মূলত মাসের প্রথম সপ্তাহেই গ্রাহকদের চিনি দিয়ে দেওয়া হয়। এপ্রিল মাস শেষ হতে চললেও এখনও বহু গ্রাহকের হাতে চিনি পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ। খাদ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গে পাহাড় এবং ডুয়ার্সের চা বাগান এলাকায় এএওয়াই র‌্যাশন কার্ডের সংখ্যা সব থেকে বেশি। চা বলয়ে গ্রাহকদের হাতে চাল, আটা ছাড়া কিছুই পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন চা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। জয়েন্ট ফোরামের নেতা অলক চক্রবর্তী বলেন, শ্রমিকরা খাওয়ার জন্য দুমুঠো চাল জোটাতে পারছেন না। চিনি কেনার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। অসাধু র‌্যাশন ডিলাররা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। আমরা তদন্ত চাই। কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার জেলা থেকে চিনি না মেলার অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহল থেকেও চিনি না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেক গ্রাহক। পোয়াতুরকুঠির এক গ্রাহক বলেন, আমার এএওয়াই কার্ড আছে। চিনি চাওয়ায় ডিলার জানিয়ে দিলেন, তাঁরা এই মাসে বরাদ্দ পাননি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের অপরপ্রান্তে থাকা ভারতীয়দের কাছে প্রশাসনের উদ্যোগে র‌্যাশনের সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সামগ্রীতে চিনি থাকছে না বলে অভিযোগ। মেখলিগঞ্জে কাঁটাতারের অপরপ্রান্তে থাকা আনোয়ার মিয়াঁ বলেন, আমাদের চিনি দেওয়া হয়নি। যাঁরা র‌্যাশন পৌঁছে দিয়ে যান তাঁরা জানিয়েছেন, শুধু চাল আর আটার সরবরাহ আছে। গ্রাহকদের হাতে না পৌঁছালে বিপুল পরিমাণ চিনি যাচ্ছে কোথায়? বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, কিছু অসাধু র‌্যাশন ডিলার সরকারি ভরতুকিতে পাওয়া চিনি খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ১৩ টাকা ৫০ পয়সায় কিনে কোথাও ২৫ টাকা কোথাও ৩০ টাকা কিলো দরে বস্তা বস্তা র‌্যাশনের চিনি বিক্রি হচ্ছে। সেই চিনি বাজার থেকে ৪০-৪৫ টাকা কিলো দরে কিনছেন সাধারণ মানুষ।