রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি… কবিগুরুর বর্ণনায় এভাবেই উঠে এসেছে ছোটো গাঁয়ের নদী। এখন মহানন্দার অবস্থাও অনেকটা তেমনই। মাসখানেক আগেও যে নদী ছিল কানায় কানায় পূর্ণ, এখন সেই নদীই জলহারা। অবস্থা এতটাই সঙ্গীন যে, জায়গায় জায়গায় মহানন্দার গতি পুরোটাই স্তব্ধ হয়ে জেগে উঠেছে চর। আর সেই চর দিয়ে হেঁটেই পারাপার করছেন এপার-ওপারের মানুষজন। ভরা নদীতে মাছ ধরে বা নদীতে খেয়া বেয়ে যাঁদের রুটিরুজি চলত, তাঁরাও এখন বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে।

পুরাতন মালদা আর মালদা শহরের মাঝ বরাবর বয়ে গেছে দুই শহরের জীবনরেখা মহানন্দা। নদী ঘিরেই এক সময় জোড়া শহরের বিকাশ ও বিবর্তন ঘটেছিল। তবে কালে-কালে নদীর অবস্থা এখন রুগ্ন। এমনকি পুরাতন মালদার বেশ কয়েটি জায়গায় নদীর অবস্থাও খুব সঙ্গীন। কোথাও কোথাও নদীর চর মাঝ বরাবর বাড়তে বাড়তে প্রায় কূল ছুঁয়ে ফেলার অবস্থা। দুই শহরের নালার বর্জ্য ও আবর্জনা মিশে জলের রং এখন কালো। তার ওপর নদীর জলে ভেসে বেড়াচ্ছে থার্মোকল আর প্লাস্টিক। কার্তিকের শেষেই তাই নদী এখানে গতিহারা। নদীর বুক জুড়ে জেগে উঠেছে বহু চর। দিন কয়েক আগে পর্যন্ত নৌকা চলাচল করলেও এখন প্রায় হেঁটেই পেরোনো যায় নদী। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরা একটি চর কেটে কোনোরকমে বাঁচিয়ে রেখেছেন নদীর গতি। এলাকার এক বাসিন্দা ননীগোপাল হালদার। বয়স তাঁর ষাট ছুঁইছুঁই। তিনি জানালেন, প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছি। তখন আইহো থেকে সদরঘাট অবধি নৌকায় চেপে দিনরাত মাছ ধরত জেলেরা। বছর দশেক আগেও সারাবছর জল থাকত মহানন্দায়। কিন্তু এখন নদীটাই মরে গিয়েছে। জল নেই, নেই মাছও। এই দুয়ের অভাবে জেলে ও মাঝিরাও তাই বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে।

- Advertisement -

পাবনাপাড়ার বেশিরভাগ বাসিন্দাই মৎস্যজীবী বা মাঝি। তবে এখন হাতেগোনা কয়েকজন বাদ দিলে বেশিরভাগ বাসিন্দাই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজে নিয়েছেন। অভিরাম হালদার নামে এক বাসিন্দা বলেন, এক সময় মাছ ধরে সংসার চললেও এখন আমি দিনমজুরের কাজ করি। নইলে না খেতে পেয়ে তো মারা যাব। একই সুরে স্বাধীন হালদার নামে অপর এক বাসিন্দা জানান, মহানন্দা থেকে মাটি কেটে নিচ্ছে মাফিয়ারা। তাই নদী খাতে বড়ো বড়ো গর্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার ট্র‌্যাক্টর ও আর্থমুভার চলাচলের জন্যও বেশ কিছু জায়গায় নদীর বুকে মাটি দিয়ে উঁচু করা হয়েছে। এমন অবস্থায় নদী বাঁচবে কী করে? স্বাভাবিকভাবে বাঁচেনি মহানন্দা নদীও। পাবনাপাড়ার কাছে তাই তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে মহানন্দা।