বনগাঁর ছায়া শিলিগুড়িতে, রাস্তায় পড়ে কাতরালেন এক ভবঘুরে

351
প্রতীকী ছবি

শিলিগুড়ি : বনগাঁর ঘটনার ছায়া শিলিগুড়িতে। বনগাঁ হাসপাতালে করোনা সংক্রামিত স্বামীকে অ্যাম্বুল্যান্সে ওঠাতে কারও সাহায্য পাননি স্ত্রী। তাঁর চোখের সামনেই হাসপাতাল চত্বরে মারা যান স্বামী। একই রকমের অমানবিকতার নিদর্শন রাখল শহর শিলিগুড়িও। সোমবার বর্ধমান বাসস্ট্যান্ডে পড়ে থাকা অসুস্থ এক ভবঘুরেকে করোনার ভয়ে কেউই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে এগিয়ে এলেন না। শেষ পর্যন্ত এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যের সহায়তায় ও পুলিশের হস্তক্ষেপে অসুস্থ ওই ভবঘুরের জেলা হাসপাতাল ঘুরে ঠাঁই হয় উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

শহরে জনবহুল এলাকাগুলোর মধ্যে বর্ধমান রোড বাসস্ট্যান্ড এলাকা অন্যতম। এখানে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডও থাকায় সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের আসা-যাওয়া চলে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বাসস্ট্যান্ডই গত কয়েকদিন ধরে এক ভবঘুরের রাতের আস্তানা হয়ে ওঠে। এদিন সকালে ওই ভবঘুরেকে বাসস্ট্যান্ডের সামনে পড়ে থাকতে দেখা যায়। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু অসুস্থকে সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেননি। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে চলে পর্যবেক্ষণ। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়। অসুস্থ ব্যক্তিটি আরও নেতিয়ে পড়েন। তখন তিনি বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায়। ঘটনাক্রমে হেল্পিং হ্যান্ডস রিলিফ ফাউন্ডেশন নামে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার এক সদস্যের বিষয়টি নজরে আসে। তিনি পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে ওই ভবঘুরেকে প্রথমে জেলা হাসপাতাল, পরে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রজত দাস বলেন, লোকটির মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছিল। করোনার ভয়ে কেউ কাছে এগোচ্ছিলেন না। আমি তবু কয়েকজনকে অনুরোধ করি ওঁকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। আমি একা কী করব। যাঁর উদ্যোগে অসুস্থ ভবঘুরের হাসপাতালে জায়গা হয়েছে, সেই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্য শুভঙ্কর সাহা বলেন, ওই ব্যক্তি করোনা সংক্রামিত হতেই পারতেন। আমার পরিবারের কারও এরকম হলে কি আমি মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে পারতাম? মানুষই তো মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াবে।

- Advertisement -

সম্প্রতি ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন চাঁদমণিতেও কারও সাহায্য না পেয়ে এক ব্যক্তির দেহ আট ঘণ্টা আঁকড়ে রেখেছিলেন তাঁর মেয়ে ও স্ত্রী। এদিনের ঘটনার পর মানুষের মানবিকতা, সহযোগিতার মনোভাব কমে যাচ্ছে বলে ফের নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রধান নির্মল বেরা বলেন, মানুষ চাইলে মাস্ক, গ্লাভস পরে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু করোনা এমন একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে যে মানুষের মধ্যে মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই ভয়ংকর। একসময় আমরাই কাউকে পাশে না পাওয়ায় বিপদে পড়ব। সাধারণ মানুষকে বিষয়টি বুঝতে হবে। শহরের সাংস্কৃতিক কর্মী পার্থ চৌধুরী বলেন, একটা সভ্যসমাজের জানা আছে কীভাবে এই রোগের সংক্রমণ ছড়ায়। এরপরও মানুষ সাহায্যপ্রার্থী মানুষের সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে। এরপর আমরা মনুষ্যজাতি হিসেবে আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারব না। শিলিগুড়ি পুরনিগমের প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য শংকর ঘোষ বলেন, আমরা প্রকৃতই সোশ্যাল ডিসট্যান্স করছি। অসুস্থ কিংবা মৃত মানুষকে নিজের পরিবার পর্যন্ত দেখছে না। তবে এর মধ্যেও কিছু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। অন্ধকারের মধ্যে তাঁরাই আশার আলো জাগিয়ে রেখেছেন।