নীহাররঞ্জন ঘোষ, মাদারিহাট : যে টাকা গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার কথা, সেই বরাদ্দের অর্ধেক টাকাই খরচ হয়ে যাচ্ছে পার্ট টাইম শিক্ষকদের বেতন দিতে। ৫ বছর ধরে এমনই চলছে ফালাকাটা ব্লকের শালকুমার গ্রাম পঞ্চায়েতের খাউচাঁদপাড়া হলং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যদিও এমনটা হওয়ার কথা ছিল না বলে জানালেন খাউচাঁদপাড়া যৌথ বন পরিচালন কমিটির সম্পাদক শম্ভু সুবা। তিনি জানান, বন দপ্তর ১৯৮১ সালে হলং প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তৈরি করে। সেসময় সেখানে বনকর্মীরাই পড়াতেন। তাঁদের বেতন বন দপ্তরই মেটাত। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই ব্যবস্থার পরিবর্তম হয়। সেইসময় একমাত্র শিক্ষক নির্মল দাসকে ওই বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে জলদাপাড়া পশ্চিম রেঞ্জে বনরক্ষার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর অথৈ জলে পড়ে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা।

শম্ভুবাবু জানান, নির্মলবাবুকে সরিয়ে নিতেই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বনকর্তাদের কাছে বহুবার দরবার করেও কোনো লাভ হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রা. ৬০ জন পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ চিন্তা এগিয়ে আসেন গ্রামের শিক্ষিত যুবক-যুবতিরা। শম্ভুবাবু জানান, ঠিক হয় ৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা পর্যায়ক্রমে শিক্ষকতা করবেন। তাঁদের প্রতিমাসে মাথাপিছু ২ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এই টাকা খাউচাঁদপাড়া যৌথ বন পরিচালন কমিটি বন দপ্তর থেকে বনবস্তির উন্নয়নে যে ভাগ পাবে সেখান থেকে দেওয়া হবে। গত ৫ বছর ধরে ওই শিক্ষকদের বেতন দিতে গিয়ে বনবস্তির উন্নয়নে সমস্যা হচ্ছে বলে তিনি জানান। ওই কমিটির সদস্য বিমান কার্জি, সুবীর কার্জি জানান, বন দপ্তর থেকে বনবস্তির উন্নয়নে প্রতিবছর ভাগের টাকা পাওয়া যায়। নিয়ম অনুযায়ী ওই টাকা বনবস্তির পানীয় জলের ব্যবস্থা, সৌরবাতি, শৌচালয় তৈরি, নিকাশিনালা তৈরি ও মেরামত করা ইত্যাদি কাজে খরচ করার কথা। এছাড়া গোরু, ছাগল, শুয়োর, মুরগি পালনের জন্য ছানা দেওয়ার কথা এই টাকা থেকেই। কিন্তু টাকার সমস্যায় ওই কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না।

কমিটির অপর সদস্য পরিমল কার্জি জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে বন দপ্তর থেকে তাঁরা ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা পেয়েছেন। এর মধ্যে ৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার বেতন দিতেই বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাকি টাকা দিয়ে যে পরিমাণ উন্নয়নমূলক কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তা করা সম্ভব হচ্ছে না। শম্ভুবাবু জানান, বন দপ্তর ওই বিদ্যালয় তৈরি করেছিল নীচুতলার বনকর্মীদের ছেলেমেয়ে ও বনবস্তির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য। কারণ প্রায় ২ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো বিদ্যালয় নেই। কিন্তু আর কতদিন তারা এভাবে ওই শিক্ষকদের বেতন দিতে পারবেন জানা নেই তাঁর। ফলে বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওই বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষিকা টিঙ্কু নার্জিনারি জানান, তাঁরা ৫ জন পর্যায়ক্রমে শিক্ষকতা করছেন। তাঁদের মাসে যে টাকা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আর কতদিন পরিসেবা দেওয়া যাবে, জানেন না তিনি।

এই বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল হয় না। বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে পুরোনো বই সংগ্রহ করে পড়ুয়াদের দেওয়া হয়। কারণ সরকারি বই এই বিদ্যালয় পায় না। অভিভাবক অমিত কার্জি জানান, এই বিদ্যালয় ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। কারণ পাশের বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। ছোটো ছেলেমেয়েদের পক্ষে এত দূরে যাওয়া মুশকিল। পাশাপাশি তাঁদের বনবস্তি জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের কোল ঘেঁষে। ফলে সবসময় বন্যপ্রাণীর আক্রমনের ভয় থাকে। বনের রাস্তায় এতদূরে ছেলেমেয়েদের পাঠানো সম্ভব নয়। এই ব্যাপারে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের বনাধিকারিক কুমার বিমল জানান, বন দপ্তর বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দেবে এমন নিয়ম নেই। যতদিন সম্ভব হয়েছে তাঁরা দিয়েছেন। বনরক্ষার কাজে বনকর্মী কম থাকায় ওই শিক্ষককে বাধ্য হয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয় চালানোর দায়িত্ব রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের. বন দপ্তরের নয়।