কাটমানির টানেই একের পর এক পঞ্চায়েতে অনাস্থা

146

গৌরহরি দাস ও তুষার দেব, কোচবিহার ও দেওয়ানহাট : উন্নয়ন নয়, উন্নয়নের জন্য টাকাটাই লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্যেই একের পর এক অনাস্থা প্রস্তাবের অবতারণা। কোচবিহারের বিভিন্ন  পঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

হাঁড়িভাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতে ১০০ দিনের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। সমস্ত কাজের জন্য প্রায় সাত কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আর এই সূত্রেই পঞ্চায়েতের দখল নিয়ে খেয়োখেয়ি মারাত্মক আকার নিয়েছে। শুধু হাঁড়িভাঙ্গাই নয়, কোচবিহারের বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতে একই ছবি। একের পর এক গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমনই যে সোমবার রাতে হাঁড়িভাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধানের বাড়িতে আগুন লাগানো হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের নীচুতলার কর্মীরাই বলছেন, পঞ্চায়েতস্তরে কাজের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে কাটমানি, কমিশন নিয়ে খেয়োখেয়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দলের নেতাদের পক্ষেও অনাস্থা আটকানো সম্ভব হয়ে উঠছে না।

- Advertisement -

কোভিডবিধি কিছুটা শিথিল হতেই কোচবিহারের বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতে ১০০ দিনের কাজের বিভিন্ন খাতে কাজ শুরু হয়েছে। আবার বেশ কিছু কাজের টেন্ডার হয়েছে। কাজ শুরুর পথে। আর গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিতে এই কাজ শুরু হতেই বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিতে তৃণমূলের খেয়োখেয়ি শুরু হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই ওকরাবাড়ি, হাঁড়িভাঙ্গা, গিতালদহ-১ সহ জেলায় প্রায় ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে অনাস্থা আনা হয়েছে। এর মধ্যে দুই-তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতে সমস্যা কিছুটা মিটলেও বাকি গ্রাম পঞ্চায়েতে সমস্যা মেটার কোনও নামই নেই। এমনকি অনাস্থা তুলে নিতে শীর্ষনেতৃত্ব চরম নির্দেশ পাঠালেও কেউ তা মানছে না। ইতিমধ্যেই দলের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে ওকরাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানকে দলের অধিকাংশ পঞ্চায়েত সদস্য অপসারণ করেছেন। অনাস্থার জেরে হাঁড়িভাঙ্গাতেও দুদিন আগে প্রধান ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছেন। সেখানেও সেই একই গল্প রয়েছে বলে দলের নীচুতলার কর্মীরা মনে করছেন।

হাঁড়িভাঙ্গার প্রাক্তন প্রধান জাহাঙ্গির আলম কোনও রাখঢাক না করে পরিষ্কারই বলছেন, গ্রাম পঞ্চায়েতে ১০০ দিনের কাজে প্রায় সাত কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এই টাকার ভাগ সংক্রান্ত কারণেই আমার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েতের অ্যাকাউন্টে ১০০ দিনের কাজের টাকা সরাসরি ঢোকে না। ঠিকাদারদের অ্যাকাউন্টে এই টাকা ঢোকে। তাহলে টাকার ভাগ কোথা থেকে আসছে? এ বিষয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতেরই এক পঞ্চায়েত সদস্যের বক্তব্য, এটা ঠিকই যে, ঠিকাদারদের অ্যাকাউন্টে এই টাকা ঢোকে। কিন্তু এই টাকা যাতে তাঁদের অ্যাকাউন্টে ঢোকে সেজন্য প্রধানকে ফান্ড ট্রান্সফার অর্ডার (এফটিও) দিতে হয়। প্রধান এফটিও না দিলে সেই টাকা ঢোকে না। আর এখানেই প্রধানদের হাতে মূল চাবিকাঠি। এই এফটিও দেওয়ার আগেই প্রধানকে ঠিকাদারকে কমিশন দিতে হয়। এই কমিশন মোট কাজের মূল্যের ২০-২৫ শতাংশ। প্রধানকে আবার পরে এই টাকার ভাগ বিভিন্ন পঞ্চায়েত সদস্য ও ছোট-বড় নেতাকে কমবেশি দিতে হয়। এর ফলেই গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিতে ডামাডোল শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত সদস্যের কথায়,  এই কারণেই দলের অনেকে দলের নির্দেশের অবমাননা করছেন।

বর্তমানে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিতে বিভিন্ন পঞ্চায়েত সদস্য কখন দলের কোন নেতার ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন বা শিবির পরিবর্তন করছেন তা বোঝা কার্যত মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার নেতারাও নিজেদের স্বার্থে কখনও কোন পঞ্চায়েত সদস্য বা অঞ্চল সভাপতিকে কাছে টেনে নিচ্ছেন বা দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।

অভিযোগ, গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে হাঁড়িভাঙ্গা অঞ্চলেও তৃণমূলের কোন্দল চরমে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সোমবার গভীর রাতে দলেরই অঞ্চল সভাপতি সমসের আলির অনুগামীদের বিরুদ্ধে গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মুক্তি বর্মনের বাড়িতে আগুন লাগানোর অভিযোগ ওঠে। মুক্তির পরিবার মঙ্গলবার এ বিষয়ে কোচবিহার কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে সমসের জানিয়েছেন। তৃণমূলের জেলা সভাপতি গিরীন্দ্রনাথ বর্মনের দাবি, বিজেপি এই ঘটনাটি ঘটিয়ে আমাদের মধ্যে কোন্দল লাগানোর চেষ্টা করছে।