করোনা চিকিৎসায় লাগামছাড়া খরচে নিয়ন্ত্রণ আনছে কমিশন

236

বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা : করোনা চিকিৎসা ও নমুনা পরীক্ষায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবগুলি যেভাবে নানান নামে রোগীদের থেকে চড়া হারে বিল আদায় করছে, তাতে রাজ্যের ক্লিনিকাল এস্টাবলিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন তীব্র উদ্বেগ ব্যক্ত করেছে। কোভিড সুরক্ষা চার্জ কতটা নেওয়া হবে, কোন দামের ওষুধ দেওয়া হবে সব ব্যাপারেই এবার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এব্যাপারে বেশ কয়েকটি নির্দেশিকা জারি করেছে কমিশন। পাশাপাশি হাসপাতালগুলিতে কর্তব্যরত ডাক্তারকেই রোগী ভর্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। কমিশন বলে দিয়েছে, এ ব্যাপারে কারও তরফে কোনও চাপ বা উমেদারি মানবেন না কর্তব্যরত চিকিৎসক।

সম্প্রতি বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে করোনা চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু রোগীর পরিবারই আর্থিক দিক থেকে চূড়ান্ত দুর্ভোগে পড়েছেন। সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে নানারকম চার্জ বাবদ বিরাট অঙ্কের টাকা বিল করা হচ্ছে বলে বারে বারে অভিযোগ উঠেছে। কমিশন বলেছে, এরকম বেশ কিছু ঘটনা তাঁদের নজরেও এসেছে। ডাক্তারের ফি ছাড়াও আউটডোরে নানা নামে স্যানিটারি চার্জের ছদ্মবেশে টাকা আদায় করা হচ্ছে।

- Advertisement -

কমিশন বলে দিয়েছে, করোনা সুরক্ষার চার্জ বাবদ রোগীর কাছ থেকে ৫০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। রোগীর সঙ্গে একজন সঙ্গীকে চেম্বারে ঢোকার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই সঙ্গীর কাছ থেকেও ৫০ টাকা কোভিড সুরক্ষা চার্জ নেওয়া যেতে পারে। এরমধ্যে স্যানিটাইজার, মাস্ক সহ সবকিছুর খরচ ধরা থাকবে। যদি চিকিৎসক পুরো পিপিই পোশাকে থাকেন, তাহলে হাসপাতাল রোগী পিছু আরও ৫০ টাকা চার্জ নিতে পারবে।

ইন্ডোরের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার পিপিই বাবদ হাসপাতালগুলিকে প্রতিদিন ১,০০০ টাকা চার্জ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু হাসপাতাল পিপিই বাদে স্যানিটাইজার, অতিরিক্ত গ্লাভস সহ অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আলাদা চার্জ নিচ্ছে। কমিশন বলে দিয়েছে, এভাবে অন্যান্য সরঞ্জাম দেখিয়ে আলাদা চার্জ নেওয়া যাবে না। দিন প্রতি ১,০০০ টাকা সামগ্রিকভাবে কোভিড সুরক্ষা চার্জ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। তার বেশি এক পয়সাও নয়।

কমিশনের কাছে অভিয়োগ গিয়েছিল, অনেক ল্যাব সরকার নির্দিষ্ট ২,২৫০ টাকা করোনা পরীক্ষার চার্জের পাশাপাশি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছিল। কমিশন বলে দিয়েছে, সরকার নির্ধারিত ওই টাকার বাইরে পরীক্ষার চার্জ হিসেবে আলাদা টাকা নেওয়া যাবে না। তবে নমুনা সংগ্রহের জন্য ল্যাব থেকে রোগীর বাড়ি আসা-যাওয়া বাবদ কিলোমিটার প্রতি ১০ টাকা বিলে যোগ করা যেতে পারে। কিন্তু  একই বাড়ি থেকে একাধিক নমুনা সংগ্রহ করা হলে যাতায়াত বাবদ আলাদা বিল করা যাবে না।

কমিশন বলেছে, চিকিৎসকরা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেও অনেক রোগী বাড়ি যেতে চাইছেন না। এর ফলে হাসপাতালগুলিতে বেড খালি পেতে সমস্যা হচ্ছে। তাই এখন থেকে চিকিৎসারত ডাক্তার তাঁর দৈনিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে রোগীকে বাড়িতে থাকার নির্দেশ দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা টেলিফোনে তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দেবেন। যদি রোগীরা কোনও কারণে বাড়িতে যেতে না চান, তাহলে তাঁকে সেফ হাউসে রেখে বাকি চিকিৎসা করা যেতে পারে। বেসরকারি হাসপাতালে বেড পাওয়া নিয়ে বারে বারে নানারকম অভিয়োগ উঠেছে। কমিশন এ ব্যাপারে পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছে কর্তব্যরত ডাক্তারকে। বলা হয়েছে, তিনি কোনও সুপারিশ বা চাপ না মেনে যে রোগীকে চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে ভর্তি করা প্রয়োজন বলে মনে করবেন, তাঁকেই ভর্তি করবেন। কর্তব্যরত ডাক্তারই রোগী ভর্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। রোগীকে সাধারণ বেড থেকে আইসিইউ বা আইটিইউতে স্থানান্তরের ব্যাপারেও চড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তিনিই।

বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে দামি ওষুধ লেখার প্রবণতাও বন্ধ করতে বলেছে কমিশন। উদাহরণস্বরূপ মেরোপেনেম নামক অ্যান্টিবায়োটিকের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির এই ওষুধটি বিভিন্ন দামে বাজারে পাওয়া যায়। কমিশনের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যদি নির্দিষ্ট কোনও ব্র‌্যান্ডের নাম সংশ্লিষ্ট ডাক্তার উল্লেখ না করেন, তাহলে কম দামের ওষুধই ফার্মাসি থেকে যেন সরবরাহ করা হয়। এর ফলে রোগীদের ওষুধের বোঝা কিছুটা কমবে। বলা হয়েছে, রোগীর আত্মীয়দের জিজ্ঞাসা করতে হবে বিভিন্ন দামের মধ্যে তাঁরা কোন দামের ওষুধটিকে বাছতে চাইছেন। সর্বোচ্চ দামের ওষুধ দেওয়া এড়াতে হবে।