বাবুল থেকে সৌরভ, আদর্শহীন খেলার রাজনীতিরই রমরমা বাংলায়

821

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

আয়া রাম, গয়া রাম আর কেন বলা হবে ভারতীয় রাজনীতিতে? ওই দুটো শব্দ তুলে দিয়ে সেখানে অন্য দুটো শব্দ বসিয়ে দেওয়া যাক। আয়া বঙ্গাল। গয়া বঙ্গাল।

- Advertisement -

গত কয়েক বছরে দলবদলে যা খেল দেখাল বাংলা, তাতে হরিয়ানা-কর্ণাটকের সাম্প্রতিক ঘোড়ারা অট্টহাস্য করে উঠবে। বিহার, উত্তরপ্রদেশ? ওখানেও ঘোড়া কেনাবেচা আর গণহারে হচ্ছে না। পুরোনো সব কার্টুনে এজাতীয় চরিত্রের মাথায় কংগ্রেসি টুপি থাকত। এখন তাদের বাঙালি ধুতি-পাঞ্জাবি পরিয়ে দেওয়া যাক।

হরিয়ানায় যা আমরা দেখেছি বংশীলাল, দেবীলাল, ভজনলালদের রাজত্বে, এককালের লাল বাংলায় সেটাই স্বাভাবিক এখন। ১৯৬৭-তে হরিয়ানার হোডালের বিধায়ক গয়া লাল নির্দল হিসেবে জিতে যোগ দেন কংগ্রেসে। তার ১৫ দিনের মধ্যে পার্টি পালটান চারবার। তৃতীয়বার কংগ্রেসে এলে, তাঁকে প্রেসের সামনে এনে কংগ্রেস নেতা রাও বীরেন্দ্র সিং বলেছিলেন, গয়া রাম আব আয়া রাম হ্যায়। কিন্তু গয়া লাল ছিলেন গয়া লালই। ক্রমাগত পার্টি পালটাতে পালটাতে যোগ দিয়েছিলেন চরণ সিংয়ের লোকদলে।

ইদানীং বিজেপির কল্যাণে কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, মণিপুর, গোয়া, অরুণাচলে যেমন দেখে আসছি ঘোড়া কেনাবেচা, আগে করত কংগ্রেস। ঘোড়ারা কথা বলতে পারলে আপত্তি জানাত, কেন আমাদের এই জন্তুদের সঙ্গে জড়ানো হয়? আমাদের তো পুরোনো প্রভুর প্রতি অনেক বেশি ভালোবাসা থাকে।

আমাদের এই বঙ্গদেশে আপাতত প্রায় প্রতিটি শহরে পাঁচ ধরনের নেতা পাওয়া যাবেই।

এক, শুধু প্রচারে মন, সাংবাদিকদের ফোন। তাঁর বদলে বিপক্ষের নাম সংবাদমাধ্যমে এলে ঘুম উধাও। জুনিয়ার নেতাদের দলে উঠতেই দেবেন না।
দুই, মানুষের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করবেন হঠাৎ ক্ষমতা পেয়ে ধরাকে সরাজ্ঞান করে। আত্মম্ভরিতা ভয়ংকর।
তিন, প্রকাশ্যেই নানা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। আবার দিল্লি-কলকাতার নেতাদের ম্যানেজও করতে ওস্তাদ।
চার, যখন যে দল ক্ষমতায় আসবে, ঠিক লজ্জার মাথাটি খেয়ে চলে যাবেন সেখানে। আদর্শ আয়া রাম, গয়া রাম। আয়া বঙ্গাল, গয়া বঙ্গাল।

আদর্শ ভো কাট্টা ঘুড়ি হয়ে রেললাইনের তারে ঝুলতে থাকবে। নেতারা বড় গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়াবেন। প্রতিদিন প্রচারমাধ্যমে দেখা দেবেন প্রতিশ্রুতি বা হুমকির জোরে। আসলে ওম বিড়লা, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়রা ভোটারদের হতাশাই বাড়িয়েছেন দলবিরোধী আইনকে উপেক্ষা করে।

ভেবে দেখুন, এই চার ধরনের নেতাকেই আপনার শহরে দেখে থাকেন কি না। ভেবে দেখুন, এই চার শ্রেণির নেতাই সবচেয়ে প্রচার নিয়ে চলে যান না? এঁদের কাছে রাজনীতি মানে আদর্শ নয়। রাজনীতি মানে প্রচার পাওয়ার, দাদাগিরি দেখানোর রাজপথ। অনুরাগীরা পিছন পিছন ঝল্লরী বাজাবে।

আপনার শহরে হয়তো এখনও এমন নেতা রয়েছেন, যাঁরা হেঁটে হেঁটে মানুষের খোঁজখবর নেন। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে বেড়ান হেঁটে বা সাইকেলে। পার্টির গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে থাকেন না, বেশি কথায় বিশ্বাসী নন। অতি আদর্শবাদী। এঁরা পঞ্চম পক্ষ। বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি।

দুঃখ কী জানেন, আপনি নিজেই পঞ্চম পক্ষকে পাত্তা দেবেন না বলিয়েকইয়ে নন বলে। আপনার কাজটা করে দিতে পারবেন না বলে। আপনি নিজেও ওই চার ধরনের নেতার কাছে জানতে চাইবেন না, এমন গাড়ি পেলেন কোথায়? আপনি তো এখন বিধায়ক নন। আপনি কলকাতা-দিল্লির নেতাদের কাছেও জানতে চাইবেন না, ওই আদর্শবাদী নেতাকে আপনারা আড়ালে রাখেন কেন?

আদর্শবাদের মাথায় যে ডান্ডা এই প্রথম পড়ল বাংলায়, তা নয়। মমতা মাঝে মাঝেই এমন কয়েকজনকে বড় পদে এনেছেন, যাঁরা সিপিএম বা নকশাল ঘনিষ্ঠ। আলিমুদ্দিন আলো করে ঘুরে বেড়াতেন একদা। রাজ্যসভা-বিধানসভায় এমন কয়েকজনকে এনেছেন, যাঁদের অনেকে অকৃতজ্ঞতা দেখিয়ে সরে গিয়েছেন দূরে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছের অভিনেত্রী চলে গিয়েছেন বিজেপিতে। মহাগুরু মিঠুন নকশালবাদ দিয়ে শুরু করে সিপিএম, তণমূল, বিজেপি ঘুরে ঘুরে পাড়ার মিঠুনদের শিখিয়ে দিয়েছেন, আদর্শবাদের মাথায় মেরে ডান্ডা, করে দিই ঠান্ডা।  এবার খেলা ভক্ত বাবুল এসে রাজনীতি ও খেলা এক করে দিলেন।

চিরদিন জেনে এসেছি, ফুটবল মাঠের দলবদলের সঙ্গে রাজনীতির মাঠের দলবদলের ফারাক বিশাল। রাজনীতিতে আদর্শই সব। খেলায় তা নয়। বাবুলের সৌজন্যে জানা গেল, নেতারা মোহনবাগানে চান্স না পেলে ইস্টবেঙ্গলের মতো বড় ক্লাবে যাবেন। ছোট ক্লাবে কেন যাবেন? উত্তরপাড়ার বঙ্গতনয়ের যুক্তি শুনলে মনে হবে, ত্রিদিব চৌধুরী, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, অশোক ঘোষেরা বৃথা বছরের পর বছর মানুষকে নিয়ে ভেবেছেন। বৃথা রাজনীতি করেছেন তথাকথিত ছোট পার্টির হয়ে

 গেরুয়া থেকে নীলে আসার পরের প্রেস মিটে দেখলাম বাবুলের জামায় সবুজ-মেরুন রং। মোহনবাগান প্রিয়তম ক্লাব বলেই কি? নিশ্চিত বলা যায়, বাবুলের কথায় মোহনবাগানের গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার, শৈলেন মান্না, চুনী গোস্বামীরা বিরক্তই হতেন আজ। তাঁদের কাছে আদর্শ অনেক বড় ছিল।

যন্ত্রণার হল, এখন বাংলায় এমন রাজনীতিবিদদেরই রমরমা। হয় দিলীপ ঘোষের মতো  উলটোপালটা বলবেন, না হয় অনুব্রত মণ্ডলের মতো। এ সবেরই বাজার। প্রশ্ন করার লোক নেই। বাংলা সিনেমার দিকে তাকান। দেখবেন, সিনেমা নেই, অথচ কত নায়িকা প্রচার নিয়ে চলে যাচ্ছেন অকারণ। খেলার দিকে তাকান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট ভাই বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা অলিম্পিক সংস্থা, বক্সিং, হকি চালাচ্ছেন। কাজের কাজ শূন্য। তিনি যাঁকে হারিয়ে অলিম্পিক সংস্থায় ক্ষমতায় এসেছেন, সেই দাদা অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় একইসঙ্গে আইএফএর প্রেসিডেন্ট ও ইস্টবেঙ্গলের সক্রিয় কর্তা। সেই নিয়ম ভাঙার খেলা।

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়- তাঁকেও কেউ প্রশ্ন করছে না, আপনার মেয়াদ তো অনেক দিন ফুরিয়েছে, আপনি আজও বোর্ড প্রেসিডেন্টের চেয়ার আঁকড়ে বসে কেন দাদা? এত নিয়ম ভাঙা আপনাকে মানায় না। বোর্ড রাজনীতিতে দুজনের কুর্সি রাখতে অমিত শার ছেলে, বোর্ড সচিব জয় মামলা করে রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টে। মাথায় ঢোকে না একটা জিনিস। প্রচুর রাজনৈতিক মামলার এত দ্রুত শুনানি হয়ে যায়, সিবিআই বা ইডি নেমে পড়ে, অথচ দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে মামলা কেন পড়ে থাকে দিনের পর দিন।

সৌরভদের মতোই মেয়াদ শেষে কোর্টে মামলা করে দিব্যি দেশের ফুটবল চালাচ্ছেন এআইএফএফ প্রেসিডেন্ট প্রফুল্ল প্যাটেল। কোথায় সে মামলার শুনানি? বোর্ডের কর্তাদের মতো ফুটবল ফেডারেশনের বাকি কর্তাদেরও প্রতিবাদ নেই।

আমরা আদর্শ নিয়ে ভাবি না। আমরা প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটি না। এই যে আমরা মাঝে মাঝে গলা কাঁপিয়ে বলি, আমরা বাঙালিরা সবার মতো নয়, একটু আলাদা, তা আলাদাটা কীসের ভাই? দুই জনপ্রিয় মুখ বাবুল আর সৌরভের মধ্যে ফারাকটা কী থাকল? কিছু না। দুই তারকার কেউই ক্ষমতার লোভ থেকে সরে আসতে পারলেন না। চেয়ার বা পদ না পেলে গ্রামের পঞ্চানন্দ পোদ্দারও কাজ করেন না, এঁরাও তাই।

রাজনীতি এখন একটা খেলা হয়ে গিয়েছে, খেলা হয়ে গিয়েছে রাজনীতি। আর বাংলায় দেখছি, দুটো জায়গাতেই ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাইদের পাইয়ে দেওয়ার খেলা। তুমি সৌরভ-ঘনিষ্ঠ হলে কিছু দায়িত্ব পাবে। তুমি মমতা বা অভিষেক-ঘনিষ্ঠ হলে পাবে। তুমি দিলীপ, সুকান্ত বা সেলিম, সুজন, অধীর-ঘনিষ্ঠ হলে কিছু পাবে। নইলে ভাই বাড়ি যাও।

যে চমৎকার প্রকল্পগুলো নিয়ে মমতা দেশে তাক লাগিয়েছেন, তার সুবিধে নিতে অনেক গরিবকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এমন ঘনিষ্ঠ ভাইদের জন্য। ভায়েরা এমন ফাঁক বের করছেন, ঘুরে-ফিরে স্থানীয় নেতাদেরই দ্বারস্থ হতে হচ্ছে গ্রামীণ মানুষকে। আবার ফিরে আসছে কমিশন নামক ভয়ংকর শব্দ। পাশের ওডিশার মতো সরকারি আমলাদের দিয়ে কাজ চালানোর ভালো চেষ্টা শুরু হয়েছে বাংলায়। সেখানেও সরকারি অফিসারদের নিয়ে অনেক গ্রাম-শহরে জোরালো দুষ্টচক্র বানিয়েছেন চার ধরনের নেতারা। মুখ্যমন্ত্রী খোঁজ নিন।

এত খেলা হবে, খেলা হবে চিল চিৎকার চারদিকে, রাজনীতিটা এখন বাংলায় সত্যিই খেলা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আদর্শহীন এক খেলা।