মাস্টার প্ল্যানের ভাঙা রেকর্ড শুনে ক্লান্ত উত্তরবঙ্গ

- Advertisement -

ভারতভুটান নদী কমিশন গঠনে কেন্দ্রীয় সরকার কখনোই আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয়নিনাকের বদলে নরুনের মতো হয়েছে ভারতভুটান রিভার এক্সপার্ট কমিটিকালেভদ্রে কমিটির বৈঠক হয়কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণের সমস্যাটির সমাধান করার কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নের কোনও লক্ষণ কখনও দেখা যায়নিলিখেছেন জ্যোতি সরকার

মালদায় গঙ্গাপাড়ের বাসিন্দারা অসহায় হয়ে দেখেন তাঁদের আবাদি জমি, বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এ দৃশ্য প্রতি বর্ষার। বছর আসে, বছর যায়, কিন্তু দৃশ্যের পরিবর্তন হয় না। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলা প্রায় প্রতি বর্ষায় বন্যার কবলে পড়ে। ভুটান থেকে নেমে আসা নদীগুলির জলোচ্ছ্বাসে উত্তরবঙ্গের এই তিন জেলা প্লাবিত হয়। এই সমস্যার প্রতিকারে ভারত-ভুটান নদী কমিশন গঠনের প্রস্তাব বারবার উচ্চারিত হয়েছে। সবাই এর প্রয়োজনীয়তা একবাক্যে মেনেও নিয়েছেন। কিন্তু প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে কখনও হেলদোল দেখা যায়নি কেন্দ্রীয় সরকারের। শুধু মোদি জমানায় নয়, মনমোহন সিংয়ে রাজত্বে কিংবা তার আগের শাসনেও। রাজ্য সরকারও যে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্যা প্রতিকারের চেষ্টা করেছে, তা নয়। বাম আমলে রাজ্য উন্নয়ন পর্ষদে উত্তরবঙ্গের কোনও প্রতিনিধি দীর্ঘদিন ঠাঁই পাননি। বিস্ময়করভাবে মহারাষ্ট্রের একজন অর্থনীতিবিদকে বামফ্রন্ট সরকার রাজ্য উন্নয়ন পর্ষদের প্রতিনিধি মনোনীত করেছিল। এতে উত্তরবঙ্গে তখন ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়ায় তড়িঘড়ি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জেতা সংক্যৃত্যায়নকে রাজ্য উন্নয়ন পর্ষদে মনোনীত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মালদার মতোই উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বন্যার প্রকোপের কথা সরকারের অজানা নয়। ডুয়ার্সে যেমন সব ভাসিয়ে দিলেও বন্যার জল তাড়াতাড়ি নেমে যায়, জলস্রোত গিয়ে মেশে অসমে ব্রহ্মপুত্র নদে। উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে সে উপায় নেই। ফলে একবার বন্যা হলে দীর্ঘদিন জলমগ্ন হয়ে থাকে বিস্তীর্ণ এলাকা। দুর্ভোগের সীমা থাকে না তখন। উত্তরবঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণে মাস্টার প্ল্যানের কথা বারবার বলা হয়েছে। পূর্বতন কংগ্রেস আমল থেকে শুরু করে বাম শাসন, পরে তৃণমূল জমানায় বারবার মাস্টার প্ল্যানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবটি কার্যকর করার বাস্তব উদ্যোগ কখনও দেখা যায়নি। অথচ পর্যটন, বন, চা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব জমা পড়ে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কোষাগারে। চা থেকে ন্যূনতম প্রতি বছর চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায় কেন্দ্র। প্রাকৃতিক বিপর্যয় পুরোপুরি রোধ করা যায় না সত্য, কিন্তু বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ করা তো সম্ভব। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আন্তরিক অভাব আছে সরকারের। তার জেরেই নাভিশ্বাস উঠেছে উত্তরবঙ্গবাসীর।

মালদা জেলার কালিয়াচক-৩, মানিকচক এবং রতুয়া ব্লকে গঙ্গার ভাঙন নতুন কথা নয়। বরং উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে এই এলাকাগুলির ভাঙন। প্রত্যেক বছর কিছু মানুষ নিজেদের বসত হারাচ্ছেন, আবাদ হারাচ্ছেন। কালিয়াচক-২ ব্লকে পঞ্চানন্দপুরের ভাঙনের খবর সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত শিরোনাম হয়। বৈষ্ণবনগর বিধানসভা এলাকার চিনা বাজারের ভাঙন তেমনই স্থানীয় বাসিন্দাদের কার্যত সারাবছরের আতঙ্ক। চলতি বছরেও ১ এবং ৪ সেপ্টেম্বর মালদা জেলায় ২০০ বাড়ি গঙ্গার গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। একরের পর একর জমি বিগত কয়েক দশকে গঙ্গা গ্রাস করেছে। কৃষিজীবী মানুষের জীবিকা এই জেলায় সবসময়ই অনিশ্চিত। অসহায় মানুষের সমস্যার প্রতিকারে সরকারের কোনও দীর্ঘস্থাযী পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। মালদায় গঙ্গার ভাঙন, ভূমিক্ষয় রোধে তদারকির দাযিত্ব ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের। সেই কর্তৃপক্ষ আবার কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা। রাজ্য ও কেন্দ্রের চাপানউতোরে মালদায় গঙ্গার তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সমস্যা সেই তিমিরেই থেকে যায়। ভাঙন নিয়ন্ত্রণে কখনোই পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয় না। বন্যাপ্রবণ উত্তরবঙ্গ, প্রতি বছর এখানকার জেলাগুলিতে সম্পদহানি হচ্ছে। সরকার চিঁড়ে, গুড় ত্রাণ হিসাবে দিয়ে নিজেদের কর্তব্য পালন করে মাত্র। স্থায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা করে না। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় আত্রেয়ী, পুনর্ভবা এবং টাঙন নদীর জলোচ্ছ্বাসে সম্পদহানি বছর ঘুরলেই হয়। তপন, গঙ্গারামপুর, বংশীহারী, কুশমণ্ডিতেও বন্যার প্রকোপ বেশি। উত্তর দিনাজপুর জেলাও বন্যার প্রকোপ থেকে মুক্ত নয়।

বামফ্রন্ট সরকারের আমলে জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০০ সালে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদ গঠিত হয়। এই পর্ষদের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান হন তৎকালীন মন্ত্রী দীনেশচন্দ্র ডাকুয়া। পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণ করে দীনেশবাবুরা ঘোষণা করেছিলেন, উত্তরবঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য মাস্টার প্ল্যান হবে। পরবর্তীতে কমল গুহ ভাইস চেয়ারম্যান হওয়ার পর মাস্টার প্ল্যান করার জন্য ওয়েকস নামে একটি সংস্থাকে দিয়ে সমীক্ষা করান। সমীক্ষার রিপোর্টও জমা পড়ে। কমল গুহ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে আন্তরিক হলেও তৎকালীন সরকারের কোষাগার থেকে তার জন্য অর্থ মঞ্জুর হয়নি। বাম জমানায় দীর্ঘদিনের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত অঙ্ক কষে বন্যায় উত্তরবঙ্গের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান তুলে ধরে মাস্টার প্ল্যানের কথা বারবার বললেও বাজেট তৈরির সময় এজন্য একটি পয়সাও বরাদ্দ করেননি কখনও। তৃণমূল সরকারের আমলেও উত্তরবঙ্গের জন্য মাস্টার প্ল্যান করার কথা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু ঘোষণাই সার। নবান্নও বন্যা নিয়ন্ত্রণে মাস্টার প্ল্যানের জন্য কোনও টাকা বরাদ্দ করেনি। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারত-ভুটান নদী কমিশন গঠনের দাবি অনেকদিনের। এই দাবির পর্যালোচনা করে বলা যায়, উত্তরবঙ্গ নাকের বদলে নরুন পেয়েছে। ভুটান থেকে সৃষ্ট নদীগুলির জলোচ্ছ্বাসে এই তিন জেলা প্রতি বছর ভাসে। কিন্তু ভারত-ভুটান নদী কমিশন গঠনে কেন্দ্রীয় সরকার কখনোই আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয়নি। নাকের বদলে নরুনের মতো হয়েছে ভারত-ভুটান রিভার এক্সপার্ট কমিটি। কালেভদ্রে এই কমিটির বৈঠক হয়। কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণের সমস্যাটির সমাধান হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই।

রাজ্যে তৃণমূল সরকারের আমলে সেচ দপ্তরের কাজের সুবিধার্থে প্রশাসনিক পুনর্গঠন হয়েছে। এর ফলে উত্তরবঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ কমিশনটাই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তৈরি করা হয়েছে উত্তর-পূর্ব সেচ বিভাগ। উত্তরবঙ্গের তিস্তা অববাহিকা এলাকা ব্রহ্মপুত্র বোর্ডের অধীন। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র বোর্ড কখনও উত্তরবঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণজনিত প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করে না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তাই সার্বিকভাবে উত্তরবঙ্গের মানুষের দিশাহারা অবস্থাই স্থাযী চিত্র। প্রতিবেশী ভুটান রাষ্ট্রে বছরের পর বছর অবৈজ্ঞানিকভাবে বন বিনাশের কারণে উত্তরবঙ্গে বন্যার প্রকোপ বেড়েছে। বিপদের ওপর বিপদ হল, ভুটানের নদীগুলি থেকে ডলোমাইটবাহিত ধূলিকণা জলের সঙ্গে এসে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলার চা আবাদি এলাকার মাটিতে থিতিয়ে পড়ছে। যার ফলে জমিতে ক্ষারের পরিমাণ বাড়ছে। পিএইচ ভ্যালু বেড়ে যাওয়ায় চা বাগানের জমির উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে আলিপুরদুয়ার জেলার মাকড়াপাড়া, বান্দাপানি এবং ঢেকলাপাড়া চা বাগানের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ডলোমাইটবাহিত ধূলিকণা এই বাগানগুলিতে মাটিতে থিতিয়ে পড়ায় এখানকার চায়ের আবাদের অস্তিত্বের সামনে চ্যালেঞ্জ আছড়ে পড়েছে। উত্তরবঙ্গের নদীভাঙনজনিত সমস্যা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের সমস্যাই এখানকার উন্নয়নকে আরও পিছনে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষের অসহায়তা বাড়লেও সরকার কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ।

- Advertisement -