বাংলাদেশের সব ইলিশই পদ্মার নয়, ভাবনার জোরে উৎপাদনে টেক্কা ঢাকার

526

জগন্নাথ বিশ্বাস

পুজো এসে গেল। তাই আকাশে আষাঢ় এলো; বাংলাদেশ বর্ষায় বিহ্বল লিখে ইলিশের গল্প শুরু করা যাচ্ছে না। তবু কবি বুদ্ধদেব বসুকে মনে পড়ছে তাঁর মেঘবর্ণ মেঘনা আর মধ্যরাত্রি; মেঘ-ঘন অন্ধকার; দুরন্ত উচ্ছল আবর্তে কুটিল নদী পদ্মার জন্য। এখানেই তো রাত্রি শেষে গোয়ালন্দে অন্ধ কালো মালগাড়ি ভরে/ জলের উজ্জ্বল শস্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব দেখা যেত। তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে ঘরে/ ইলিশ ভাজার গন্ধ। এখন আর সেই গন্ধ গলির মোড়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। সেটা শহুরে নর্দমার দুর্গন্ধের জন্য নয়, আসল কারণ, যা ভাজছেন সেটা পদ্মার ইলিশ তো?

- Advertisement -

একই সঙ্গে দুটি ইঙ্গিত আছে এই প্রশ্নের মধ্যে। এক, পদ্মার ইলিশ স্বাদে-গন্ধে অনন্য। দুই, বাংলাদেশ থেকে যে ইলিশ পশ্চিমবঙ্গে যায় তা সব পদ্মার নয়। গোয়ালন্দ ঘাটের কাছে পদ্মা আর মেঘনা নদীর মোহনায় এককালে রাশি রাশি ইলিশ পাওয়া যেত। এখন যায় না। কারণ সাগর মোহনা খুঁটা ও বেহুন্দি জাল দিয়ে ঘিরে রাখা। তবু বাংলাদেশ সরকারের আইন বেশ কড়া। ২০০৩ সালে মা ইলিশ শিকার বন্ধ করে ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে বন্ধ হয় প্রজনন মরশুমে ইলিশ ধরা। এতে জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেখে তাঁদের খাবার দেওয়া শুরু করে সরকার। ২০১৮ সালের হিসেব বলছে, ইলিশপ্রধান ৮৫টি উপজেলায় দুই লক্ষ ৩৮ হাজার জেলে পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি করে চার মাস চাল দেওয়া হয়। তারপরেও বেআইনিভাবে ইলিশ শিকার করলে কঠোর শাস্তি। ভারতে এটা হয় কি না জানি না, তবে বাংলাদেশের মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ পর্যবেক্ষণ সেলের তথ্য আশা জাগানোর। ১৫ বছর আগে দেশের ২৪টি উপজেলার নদীতে ইলিশের বিচরণ ছিল। এখন ইলিশ আছে ১২৫টি নদীতে।

আরেকটা পরিসংখ্যান দুই বাংলার ইলিশ উৎপাদনের ফারাক বুঝিয়ে দেবে। মৎস্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের ২০২০ সালের হিসেব বলছে, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ বাংলাদেশের। ২০১৬ সালে সেটা ছিল ৬৫ শতাংশ। ভারত ইলিশ উৎপাদনে দুনম্বরে। পাঁচ বছর আগে ভারত উৎপাদন করত ২৫ শতাংশ। ২০২০ সালে সেটা দাঁড়ায় ১০ শতাংশে। বুঝতেই পারছেন ফারাকটা।

বাংলাদেশে ইলিশের মূল কেন্দ্র বরিশাল। সেখানে ২০২০ সালের জুলাইয়ে ইলিশ উঠেছিল ১৮ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন। এবারের জুলাইয়ে তা কমে ১১ হাজার ২২২ টন। এরপরও বঙ্গবন্ধু-কন্যা ভারতে ইলিশ পাঠিয়ে বদান্যতা দেখিয়েছেন। ২০১৯ সালে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি করা হয়। গতবছর ১,৪৭৫ টন। এবার ২,০৮০ মেট্রিক টন।

ঢাকার বাজারে এর প্রভাব কতটা? যে ইলিশ আমরা গত বছর আটশো টাকায় কিনেছি, এবার সেটার দাম চোদ্দোশো। বাজারে আগুনে দামের আঁচ অনেকের মনেও লাগছে। ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশের অনেকেই বলছেন, যারা বিপদে টিকা দেয় না, তিস্তার জল দেয় না, পেঁয়াজের চালান আটকায়, তাদের জন্য এত দরদ ভালো নয়।

রাজনৈতিক কচকচি থামিয়ে ইলিশের স্বাদের কথায় ফেরা যাক। দুই বাংলায় পদ্মার ইলিশ নিয়ে আদিখ্যেতার প্রধান কারণ তো স্বাদ। বিল, ঝিল, হাওড়-বাওড় আর জপমালার মতো ছড়িয়ে থাকা নদীর দেশে নানা স্বাদের অজস্র মাছ। তবে বাঙালি কিন্তু সেরা মাছটা বেছে নিতে ভুল করেনি। সৈয়দ মুজতবা আলি তো আর এমনি বলেননি, বেহস্তে ইলিশ নেই বলে সেখানে যাওয়ার কণামাত্র বাসনাও আমার নেই।

ইলিশ ধরা থেকে শুরু করে রাঁধা পর্যন্ত একটা প্রতিষ্ঠিত কালচার বিদ্যমান। এই রজতকান্তি মৎস্যরাজ রূপে মন ভোলাবেই। গুণেও। কিন্তু চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটের ইলিশ আর পদ্মার ইলিশ এক নয়। কোথায় ধরা পড়ল, তার উপরে এর স্বাদ নির্ভর করে।

পদ্মার ইলিশ কী করে বুঝবেন? এমনিতে ইলিশ সাগরের মাছ। সাগর থেকে যতই নদীর ভিতরে ডিম পাড়তে আসে, ততই শরীর থেকে লবণ সহ বিভিন্ন সমুদ্রজাত খনিজ ঝরে যায়। এছাড়া প্ল্যাংটন বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ইলিশের স্বাদে প্রভাব ফেলে। প্ল্যাংটন খুব গুরুত্বপূর্ণ, নদীতে ইলিশের খাবার। যা খেলে তার শরীর বেঁটে ও মোটা হয়। চর্বি জমে। সাগরের ইলিশ লম্বা। স্লিম। পদ্মাতে প্রচুর প্ল্যাংটন খাওয়া ইলিশ বেঁটে, মোটা চর্বিযুক্ত গোলগাল হয়। জলের গুণেই পদ্মার ইলিশ চকচকে রুপালি। মাথা বরাবর ঘাড়ের দিকে সবুজের আভা। টাটকা ইলিশের চোখ লাল।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে কোথায়? বরিশালের ভোলায়। মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী, সাগর মোহনাই ইলিশের প্রাপ্তিস্থান। ভোলার পরেই বরগুনা। জেলার প্রধান তিন নদী বিষখালি, বুড়িশ্বর (পায়রা নদীও বলেন অনেকে), বলেশ্বরে ধরা পড়ে প্রচুর ইলিশ। স্বাদে-গন্ধে বরিশালের চেয়ে পিছিয়ে

ইলিশ আহরণে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম পটুয়াখালি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। অধিকাংশ সাগরের ইলিশ। সামান্য কিছু কর্ণফুলি নদীতে ধরা পড়লেও পদ্মার ইলিশের সঙ্গে তুলনা চলে না। ছয় নম্বরে চাঁদপুর জেলা। বাংলাদেশে বলে ইলিশের বাড়ি। এখানে পদ্মায় প্ল্যাংটন প্রচুর। ইলিশের শরীর থেকে লবণাক্ত রাসায়নিকও ঝরে যায়। পায়রা, তেঁতুলিয়া সহ সাগর তীরবর্তী নদীগুলোতে জেলেদের ফাঁদ এড়িয়ে মেঘনা দিয়ে চাঁদপুরের পদ্মায় ডিম ছাড়তে আসা ইলিশ সবার সেরা। এমন ইলিশ বেশি মেলে না।

চাঁদপুরে বেশি মেঘনার ইলিশ। মতলবের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী সহ বিভিন্ন স্থানে। সাগরের দিক থেকে পদ্মা শুরু চাঁদপুরে। চাঁদপুরে মেঘনা সমুদ্র থেকে কাছে। পদ্মা আবার দূরে। তাই পদ্মার ইলিশ মেঘনার তুলনায় স্বাদে ভালো। ইলিশ যত উজান বেয়ে পদ্মার ভেতরে ঢুকবে, তত হবে স্বাদে-গন্ধে অনন্য। এ কারণে মোহনায় ধরা ইলিশ আর গোয়ালন্দের কাছের পদ্মায় ধরা ইলিশের স্বাদে পার্থক্য। দামেও। এই তো সেদিন, ১১ সেপ্টেম্বর গোয়ালন্দের গোবিন্দ হালদারের জালে দুটি ইলিশ ধরা পড়ে। দুই কেজি করে ওজন। বিক্রি করেছেন ১০ হাজারে। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় খবরও হয়েছে।

প্রশ্ন হল, গঙ্গাপারের মানুষ কি পদ্মার ইলিশ খাচ্ছেন? উত্তর হল, থাকলে তো খাবেন। মোহনার জালের ফাঁদ, আশপাশের নদী পেরিয়ে বেশি ইলিশ পদ্মায় আসে না। যা ধরা পড়ে, বেশি যায় উচ্চবিত্তদের পেটে। সামান্য রপ্তানিও হয়। তবে টনকে টন যে ইলিশ পুজোর উপহার হিসাবে গেল, তা ভোলা (বরিশাল), বরগুনা, পটুয়াখালি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ইলিশ। শেষ তিনটি জায়গার ইলিশ কিন্তু সামুদ্রিক ইলিশই। চাঁদপুরের পদ্মার ইলিশও আছে, তবে যৎসামান্য।

এটা জেনে দাদা-দিদিরা আবার মন খারাপ করবেন না যেন। ভাজা-ভাপা-ঝোল-তরকারি যেভাবেই রাঁধবেন, আপনার গঙ্গার ইলিশের চেয়ে এগুলো স্বাদে পিছিয়ে থাকবে না।

বাংলাদেশে ইলিশের প্রায় ৫০ রকম রন্ধনপ্রণালী। সর্ষে, দোপেঁয়াজি তো সবাই জানেন। ডিম ভর্তি ইলিশ মাছ আর সুগন্ধি চাল দিয়ে বিশেষ রান্না হয় যা এদেশে ভাতুরি বা ইলিশ-পোলাও নামে পরিচিত। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে সাবধান, বেশি ঘাঁটতে গেলে কাঁটা ছড়িয়ে পড়বে। কথায় আছে না, ইলিশ মাছের তিরিশ কাঁটা/ বোয়াল মাছের দাড়ি/ ইয়াহিয়া (খান) ভিক্ষা করে/ শেখ মুজিবের বাড়ি।

একথা-সেকথা বলতে বলতে একাত্তরে বাঁধা ছড়াটা যখন এসেই পড়ল, তখন বলতেই হবে, ইলিশ শুধু স্বাদে পাগল করেনি, একসময় আমাদের জাতীয়তাবাদী মনকেও নাড়া দিয়েছিল। হয়তো সেজন্যই ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। যা বাঁচিয়ে রাখতে সরকার তৎপর।

(লেখক ঢাকার বাসিন্দা। সাংবাদিক)